Skip to main content
তথ্য উপাত্ত

কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার নিয়ম ও পদ্ধতি: পুরোহিত ছাড়াই বাড়িতে ধাপে ধাপে

দদেব দেবাশীষ
October 14, 2026
12 min read
0

কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা পুরোহিত ছাড়াই বাড়িতে করা যায়, নিয়মও সহজ। দিনে স্নান সেরে ঘর পরিষ্কার করে আলপনা দিন। আশ্বিনের পূর্ণিমার সন্ধ্যায়, প্রদোষকালে (২০২৬ সালে ৭ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার; ইংরেজি ২৫ অক্টোবর), ধানের ওপর ঘট বসিয়ে ধ্যান ও আবাহন করুন, নামমন্ত্র বলে চন্দন, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য দিন। তারপর পুষ্পাঞ্জলি, প্রণাম ও পাঁচালি পাঠ সেরে রাত জাগুন।

নিচে প্রতিটি ধাপ আর মূল মন্ত্র অর্থসহ দেওয়া হলো। কোন নিয়ম শাস্ত্রীয়, কোনটা প্রচলিত লোকাচার বা পারিবারিক রীতি, তাও আলাদা করে বলা আছে। পরিবারে আলাদা রীতি থাকলে সেটাই মানুন।

কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা কী, আর কেন রাত জাগা

"কোজাগরী" (অনেকে লেখেন কোজাগরি) কথাটি এসেছে সংস্কৃত "কো জাগর্তি?" থেকে, যার মানে "কে জেগে আছ?"। প্রচলিত বিশ্বাস, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী খোঁজ নেন, কে জেগে আছেন। শাস্ত্রে আশ্বিনের এই পূর্ণিমার রাতের নাম কৌমুদী।

পূজার শাস্ত্রীয় ভিত্তি লিঙ্গপুরাণের একটি অংশ। বাংলার স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন তাঁর তিথ্যাদিতত্ত্বে অংশটি উদ্ধৃত করেছেন, আর রাধাকান্ত দেবের শব্দকল্পদ্রুম অভিধানে "কোজাগর" শব্দের নিচে তা ছাপা আছে:

আশ্বিনে পৌর্ণমাস্যাং তু চরেজ্জাগরণং নিশি।

কৌমুদী সা সমাখ্যাতা কার্যা লোকবিভূতয়ে॥

কৌমুদ্যাং পূজয়েল্লক্ষ্মীমিন্দ্রমৈরাবতং স্থিরম্।

সুগন্ধির্নিশি সদ্বেশশ্চাক্ষৈর্জাগরণং চরেৎ॥

নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ কো জাগর্তীতি ভাষিণী।

তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ॥

অর্থ: আশ্বিনের পূর্ণিমায় রাত জেগে থাকতে হয়; এই রাতের নাম কৌমুদী, জগতের মঙ্গলের জন্য এটি পালনীয়। কৌমুদীতে লক্ষ্মী ও ঐরাবতসহ ইন্দ্রের পূজা করবে; সুগন্ধি মেখে, সুন্দর বেশে, অক্ষক্রীড়ায় রাত জাগবে। মাঝরাতে বরদাত্রী লক্ষ্মী বলেন, "কে জেগে আছ?" — যে জেগে অক্ষক্রীড়া করে, তাকে আমি ধন দিই।

শাস্ত্রমতে তাই এই রাতের মূল কথা দুটি: লক্ষ্মী ও ঐরাবতসহ ইন্দ্রের পূজা, আর সুন্দর বেশে রাত জাগা। রাত জাগার উপায় হিসেবে শ্লোকে অক্ষক্রীড়া, অর্থাৎ পাশা খেলার কথাও আছে। নারদপুরাণে এই ব্রতের আরও বড় আয়োজনের কথা আছে, যেমন সোনার প্রতিমা, চাঁদ ওঠার পর অনেক ঘিয়ের প্রদীপ আর সারা রাত জাগরণ; ঘরের পূজায় এত আয়োজন লাগে না।

ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের মতে শরতের কোজাগর উৎসবের সঙ্গে লক্ষ্মীপূজার যোগ মোটামুটি দ্বাদশ শতকের আগে ছিল না, আর বাংলায় লক্ষ্মী সবার আগে ধান-শস্যের দেবী। বাংলায় কোজাগরী মূলত ঘরের পূজা, স্ত্রী-আচার; প্রথাগতভাবে বাড়ির মেয়েরাই এ পূজা করেন।

কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা কখন করবেন

পূজা হয় আশ্বিনের পূর্ণিমার রাতে, যে সন্ধ্যা ও রাতে পূর্ণিমা তিথি থাকে। পঞ্জিকা পূজার সময় দেয় প্রদোষে, সূর্যাস্তের পরের প্রায় ৯৬ মিনিটে (দুই মুহূর্ত)। যাঁদের পরিবারে মাঝরাতে পূজার রীতি, তাঁরা নিশীথকালে পূজা করেন (পারিবারিক রীতি)। সারা রাত জেগে থাকা (নিশিপালন) পূজার পরের আলাদা রীতি।

২০২৬ সালে পূজা ৭ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৬)। আশ্বিনের পূর্ণিমা হলেও সৌর মাসের হিসাবে দিনটি এবার কার্তিকে পড়েছে। নিচের সময়গুলো বাংলাদেশ সময়ে:

  • প্রদোষে পূজা (বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মতে): সন্ধ্যা ৫টা ৩১ মিনিট থেকে ৭টা ৭ মিনিট।
  • নিশীথকাল (দৃক্‌ গণনা, ঢাকা), মাঝরাতে পূজার রীতি থাকলে: ৭ কার্তিক (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১১টা ১৭ মিনিট থেকে ১২টা ৮ মিনিট।
  • পূর্ণিমা তিথি: বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মতে ৭ কার্তিক (২৫ অক্টোবর) সকাল ১১টা ২৯ মিনিট থেকে ৮ কার্তিক (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টা ২০ মিনিট; দৃক্‌ গণনায় (মন্দিরবিডির পঞ্জিকা) ৭ কার্তিক (২৫ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ২৬ মিনিট থেকে ৮ কার্তিক (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টা ১১ মিনিট।

পঞ্জিকায় সময় ভারতীয় সময়ে ছাপা; বাংলাদেশ সময়ে ৩০ মিনিট যোগ করে দেওয়া হলো। যেমন বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকায় প্রদোষ ছাপা আছে বিকেল ৫টা ১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিট (ভারতীয় সময়)। দৃক্‌ গণনার সময় ঢাকার জন্য বাংলাদেশ সময়েই হিসাব করা, এতে কিছু যোগ করতে হবে না। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা এই দৃক্‌ গণনা মানে, তবে সেটিও ভারতীয় সময়ে ছাপা; তার সময়ে ৩০ মিনিট যোগ করে মেলান, এক-দুই মিনিট তফাত হতে পারে।

অনেক ক্যালেন্ডারে, মন্দিরবিডির পঞ্জিকাতেও, ৮ কার্তিককে (২৬ অক্টোবর) পূর্ণিমার দিন দেখানো হয়, কারণ সেদিন সূর্যোদয়ের সময় পূর্ণিমা থাকে। কিন্তু কোজাগরী রাতের পূজা; দুই গণনাতেই পূর্ণিমার রাত ৭ কার্তিক (২৫ অক্টোবর)। কিছু জায়গায় ২৪ বা ২৬ অক্টোবর লেখা দেখা যাচ্ছে; ৬ কার্তিক (২৪ অক্টোবর) আসলে চতুর্দশী। দুই গণনায় পূর্ণিমা লাগার সময়ে প্রায় এক ঘণ্টার তফাত, তাই আপনার মন্দির বা পরিবার যে পঞ্জিকা মানে, সেটিই মানুন, আর পুরোহিতের কাছে জেনে নিন। বিস্তারিত পাবেন এ বছরের পূর্ণিমা ও পূজার সময়ের লেখায়।

লক্ষ্মী পূজার আগের প্রস্তুতি ও আলপনা

দিনের বেলাতেই ঘর ও পূজার জায়গা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করুন। স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরুন। অনেকে দিনে প্রস্তুতির সময় ছোট তামার পাত্রে সূর্যকে জল দেন (প্রচলিত লোকাচার)।

উপকরণ আগেই গুছিয়ে রাখুন। ঘরোয়া পূজায় সাধারণত লাগে: সিঁদুর, ঘট, ধান, মাটি, আমপল্লব (বিজোড় পাতার একটি ডাল), ফুল, দূর্বা, নারায়ণের জন্য দুটি তুলসীপাতা, একটি কাঁঠালি কলা অথবা একটি হরীতকী, চন্দন, আতপ চাল, গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল, একটি ছোট তামার পাত্র, ধূপ, প্রদীপ আর নৈবেদ্য। শাঁখ আর একটি জলচৌকি বা পিঁড়ি থাকলে ভালো। পুরো তালিকা ও পরিমাণ পাবেন কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার ফর্দে।

আলপনা দেওয়া হয় চালের পিটুলি দিয়ে: চাল জলে ভিজিয়ে বেটে তৈরি সাদা গোলা। দরজা থেকে ঘরের ভেতরে পূজার আসন পর্যন্ত, আর বাড়িতে ধানের গোলা থাকলে সেদিকেও, ছোট ছোট পায়ের ছাপ আঁকা হয়; একে বলে লক্ষ্মীর পা, যেন দেবী ঘরে ঢুকছেন। আসনের চারপাশে ধানের ছড়া, পদ্ম, পেঁচা আর কড়ির নকশা আঁকা হয়। আলপনা প্রচলিত লোকাচার; নকশা বাড়িভেদে আলাদা।

প্রতিমা, সরা, ঘট, আড়ি, কলার বেড় ও সপ্ততরী: কোন রূপে পূজা করবেন

লক্ষ্মীকে কোন রূপে পূজা করবেন, তা আঞ্চলিক ও পারিবারিক রীতির ব্যাপার। পুরোহিতেরা বলেন, কোনো একটি রূপ বাধ্যতামূলক নয়; পরিবারে যা চলে আসছে, সেটাই রাখুন।

  • প্রতিমা: মাটির প্রতিমা। পশ্চিমবঙ্গে এটাই বেশি দেখা যায়।
  • লক্ষ্মীর সরা: ছবি আঁকা মাটির সরা; বাংলাদেশের অনেক পরিবারে সরাতেই পূজা হয়। বাংলাপিডিয়া চার ধরনের সরার কথা বলে: ঢাকাই, ফরিদপুরী, সুরেশ্বরী (বৃহত্তর ফরিদপুরের সুরেশ্বর গ্রামের) আর গণকী।
  • ঘট, ছবি বা পট: জলভরা ঘটে, অথবা দেবীর ছবি বা আঁকা পট সামনে রেখে পূজা। ঘরোয়া পূজায় এটাই সবচেয়ে সহজ।
  • আড়ি লক্ষ্মী: বেতের ঝুড়ি বা কুনকেতে নতুন ধান ভরে, লাল কাপড় জড়িয়ে, সঙ্গে দুটি সিঁদুর কৌটো রেখে পূজা।
  • কলার বেড় বা বের লক্ষ্মী: কলাগাছের বাকলে বানানো গোল বেড়ের ভেতরে পাঁচ রকম শস্য ভরে ওপরে একটি ডাব বসানো হয়। গড়ন পরিবারভেদে আলাদা।
  • সপ্ততরী: কলার খোলে বানানো সাতটি নৌকা, বণিকদের বাণিজ্যযাত্রার স্মৃতির সঙ্গে জড়ানো।

লক্ষ্মী পূজায় ঘট স্থাপনের নিয়ম

সরা বা প্রতিমা থাকুক বা না থাকুক, ঘরোয়া পূজায় সাধারণত একটি ঘট পাতা হয়। নিচের নিয়ম প্রচলিত লোকাচার, পুরোহিত দর্পণ ধারার ঘরোয়া বিধি থেকে নেওয়া। ঘট সাধারণত মাটি বা তামার হয়; লোহা বা স্টিলের পাত্র নয়।

  1. পূজার জায়গায় জলচৌকি বা পিঁড়ি পাতুন; চাইলে ওপরে লাল কাপড় বিছিয়ে দিন।
  2. এক মুঠো মাটি রেখে তার ওপর ধান ছড়িয়ে দিন।
  3. ঘটে গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল ভরে মাটি ও ধানের ওপর বসান।
  4. সিঁদুর দিয়ে ঘটের গায়ে স্বস্তিক আঁকুন।
  5. ঘটের মুখে আমপল্লব দিন: বিজোড় সংখ্যার পাতাসহ একটি ডাল।
  6. পল্লবের ওপর একটি কাঁঠালি কলা অথবা একটি হরীতকী রাখুন, সঙ্গে ফুল।
  7. ঘটের পাশে পিটুলিতে দেবীর পায়ের ছাপ আঁকুন; পাদ্যের জল এখানেই দেওয়া হয়।

লক্ষ্মীর ঘটে তুলসীপাতা দেওয়া হয় না; দুটি তুলসীপাতা আলাদা করে নারায়ণের জন্য রাখুন।

ধাপে ধাপে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা পদ্ধতি

নিচের ক্রম প্রচলিত ঘরোয়া বিধি, পুরোহিত দর্পণ ধারার পূজাপদ্ধতি অনুসারে সাজানো। পূজার সময় কথা কম বলুন, পরিবেশ শান্ত রাখুন।

  1. প্রস্তুতি: স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড়ে আসনে বসুন।
  2. শুদ্ধি: গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল মাথায় ও আসনে ছিটিয়ে নারায়ণকে স্মরণ করুন।
  3. ঘট ও প্রদীপ: ওপরের নিয়মে ঘট বসান, প্রদীপ জ্বালুন।
  4. ধ্যান: মন্ত্র জানলে ধ্যানমন্ত্র পড়ুন। না জানলে চোখ বুজে দেবীর রূপ মনে আনুন: পদ্মাসনে বসা, গৌরবর্ণা, অলংকারে সাজানো, হাতে সোনার পদ্ম, ডান হাতে বর দিচ্ছেন।
  5. আবাহন: বাংলায় বলুন, "মা লক্ষ্মী, আমার ঘরে এসো, এই আসনে অধিষ্ঠান করো, পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকো, আমার পূজা গ্রহণ করো।" সংস্কৃত আবাহন শুরু হয় "ওঁ লক্ষ্মীদেবি ইহাগচ্ছ…" দিয়ে; পুরোটা পড়তে চাইলে ছাপা পুরোহিত দর্পণ থেকে পড়ুন।
  6. মানস পূজা: মনে মনে দেবীকে ফুল, জল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদন করুন।
  7. উপচার ও নামমন্ত্র: প্রথমে পাদ্য, অর্থাৎ ঘটের পাশে আঁকা পায়ের ছাপে একটু জল; তারপর অর্ঘ্য, আতপ চাল ও দূর্বা। এরপর একে একে চন্দন, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য দিন, প্রতিটির সঙ্গে নামমন্ত্র বলে:

    ওঁ শ্রীং লক্ষ্মীদেব্যৈ নমঃ

    অর্থ: দেবী লক্ষ্মীকে প্রণাম।

    গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য, এই পাঁচটিকে বলে পঞ্চোপচার। দশোপচার ও ষোড়শোপচার পূজা আরও বিস্তৃত।

  8. পুষ্পাঞ্জলি: চন্দনমাখা ফুল হাতে নিয়ে মন্ত্র পড়ে দেবীকে অঞ্জলি দিন; এক, তিন বা পাঁচবার।

    ওঁ নমস্তে সর্বদেবানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।

    যা গতিস্ত্বৎপ্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্ত্বদর্চনাৎ॥

    এষ সচন্দনপুষ্পাঞ্জলিঃ ওঁ শ্রীং লক্ষ্মীদেব্যৈ নমঃ॥

    অর্থ: হে হরিপ্রিয়া, তুমি সব দেবতাকে বর দাও, তোমায় প্রণাম। যারা তোমার শরণ নেয় তারা যে গতি পায়, তোমার পূজায় আমারও যেন তা-ই হয়। এই চন্দনমাখা ফুলের অঞ্জলি দেবী লক্ষ্মীকে নিবেদন করি।

  9. নারায়ণ ও অন্য দেবতা: নারায়ণকে একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা দিন। ইন্দ্র ও কুবেরকে একটি করে ফুল দিন, দেবীর বাহন পেঁচাকেও একটি ফুল।
  10. জপ: দীক্ষিত হলে গুরুমন্ত্র জপ করুন।
  11. প্রণাম: হাতজোড় করে প্রণাম মন্ত্র পড়ুন।

    ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।

    সর্বতঃ পাহি মাং দেবি মহালক্ষ্মি নমোঽস্তু তে॥

    অর্থ: হে পদ্মা, পদ্মে যাঁর বাস, হে শুভা, তুমি বিশ্বরূপ বিষ্ণুর পত্নী। হে দেবী, সব দিক থেকে আমাকে রক্ষা করো; মহালক্ষ্মী, তোমাকে প্রণাম।

  12. পাঁচালি পাঠ: লক্ষ্মীর ব্রতকথা বা পাঁচালী পড়ুন; যাঁরা শোনেন, তাঁরা হাতে দূর্বা রাখেন। শেষে শাঁখ বাজান, উলুধ্বনি দিন।
  13. রাত জাগা: চিঁড়া ও নারকেল খান, ডাবের জল পান করুন, পরিবারের সবাই মিলে রাত জাগুন।
  14. প্রসাদ বিতরণ: পরিবার, প্রতিবেশী ও অতিথিদের মধ্যে প্রসাদ ভাগ করে দিন।

বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকায় একই সন্ধ্যার সময়ে শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ ব্রতের কথাও আছে; অনেক পরিবার দুটিই করেন। ধ্যানমন্ত্র, নারায়ণ প্রণাম, লক্ষ্মী গায়ত্রী আর শ্রীশ্রীচণ্ডীর স্তুতি অর্থসহ পাবেন লক্ষ্মী পূজার মন্ত্রের লেখায়।

লক্ষ্মী পূজার নৈবেদ্য ও ভোগ: কী দেবেন

নৈবেদ্যে সাধারণত থাকে পাঁচ রকম ফল (কলাসহ), নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, চিঁড়ার মোয়া, খই, মুড়কি, বাতাসা, চিঁড়া আর ডাবের জল। অনেক বাড়িতে এসব কলাপাতায় সাজিয়ে দেওয়া হয়।

রান্না করা ভোগের কোনো বাঁধা তালিকা নেই। অনেক বাড়িতে খিচুড়ি, লাবড়া, পাঁচ রকম ভাজা, পায়েস, লুচি, সুজি আর চাটনি হয় (প্রচলিত লোকাচার)।

মাছ নিয়ে দুই রকম রীতি আছে, দুটিই আঞ্চলিক বা পারিবারিক রীতি। পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ বাড়িতে দিনটি নিরামিষ। অন্যদিকে ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অনেক বাঙাল পরিবারে লক্ষ্মীকে মাছ ভোগ দেওয়া হয়, প্রথা মতে জোড়া ইলিশ।

তবে ইলিশের বেলায় এ বছর একটি বাধা আছে: সরকারি নিষেধাজ্ঞায় ২০২৬ সালের ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর দেশে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি বন্ধ, আর লক্ষ্মীপূজা পড়েছে এর মধ্যেই। তাই যাঁদের বাড়িতে ইলিশ ভোগের রীতি, তাঁরা এ বছর অন্য মাছ বা নিরামিষ ভোগ দিন।

উপবাস, রাত জাগা ও কোজাগরকৃত্য

উপবাস: অনেকে পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত উপবাস রাখেন। এটি প্রচলিত লোকাচার, বাধ্যতামূলক নয়। পূজার পরে চিঁড়া আর নারকেল বা ডাবের জল দিয়ে উপবাস ভাঙা হয়।

রাত জাগা: এই রাতে জেগে থাকার বিধান শাস্ত্রেই আছে, ওপরের শ্লোকে যেমন দেখলেন (শাস্ত্রীয়)। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা রাতের এই কাজকে বলেছে কোজাগরকৃত্য: নারকেলসহ চিঁড়া খাওয়া, ডাবের জল পান আর অক্ষক্রীড়ায় রাত জাগা। শব্দকল্পদ্রুমে উদ্ধৃত আরেকটি শ্লোকে আছে, নারকেল আর চিঁড়া আগে পিতৃপুরুষ ও দেবতাদের নিবেদন করে, আত্মীয়দের সঙ্গে ভাগ করে, তারপর নিজে খেতে হয়।

অক্ষক্রীড়া: অক্ষক্রীড়া মানে পাশা খেলা; শ্লোকে এটি এসেছে রাত জাগার উপায় হিসেবে, আর কোনো কোনো পরিবারে আজও পাশা খেলে রাত জাগা হয় (পারিবারিক রীতি)। খেললে পরিবারের মধ্যে, শুধু আনন্দের জন্য খেলুন; টাকা-পয়সা বাজি রেখে কখনো নয়।

ব্রতকথা: কোজাগরীর একটি প্রচলিত ব্রতকথায় (আশুতোষ মজুমদারের মেয়েদের ব্রতকথা-র ধারায়) এক রাজা কথা রাখতে হাটের অবিক্রীত জিনিস, কামারের গড়া লোহার অলক্ষ্মী মূর্তি, কিনে ফেলেন। তাতে রাজলক্ষ্মী, ভাগ্যলক্ষ্মী, যশোলক্ষ্মী ও কুললক্ষ্মী একে একে রাজবাড়ি ছেড়ে যান; থেকে যান শুধু ধর্ম, কারণ রাজা তাঁকে যেতে দেননি। শেষে রানি গ্রামের মেয়েদের নিয়ে পিটুলির প্রতিমা, নারকেল, চিঁড়া আর সারা রাত জাগরণে কোজাগরী ব্রত করেন, আর রাজ্যে সমৃদ্ধি ফেরে। ব্রতকথা ও পাঁচালির নানা রূপ আছে, রচয়িতার নাম জানা যায় না।

কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার নিয়ম: যা করবেন না

নিচের তিনটি নিয়ম বহু বাড়িতে মানা হয়। এগুলো প্রচলিত লোকাচার; শাস্ত্রে এদের নির্দিষ্ট বিধান আমরা পাইনি।

  • ঘণ্টা বা কাঁসর বাজানো হয় না; তার বদলে শাঁখ বাজান ও উলুধ্বনি দিন।
  • লক্ষ্মীর ঘটে তুলসীপাতা নয়, তুলসী নারায়ণের জন্য। প্রচলিত বিশ্বাস, পুরাণের কাহিনিতে তুলসী ও লক্ষ্মীর বিরোধ থেকেই রীতিটি এসেছে।
  • লোহা বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা হয় না। লোহাকে অলক্ষ্মীর সঙ্গে জড়ানো হয়; ব্রতকথার রাজাও লোহার অলক্ষ্মী কিনেছিলেন।

সাদা ফুল, কালো পোশাক বা সন্ধ্যার পর ঝাঁট দেওয়া নিয়ে যেসব নিষেধ শোনা যায়, সেগুলোর নির্ভরযোগ্য সূত্র মেলে না; পরিবারভেদে রীতি আলাদা। কলাসহ এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর: লক্ষ্মী পূজায় কলা লাগে না কেন? কলা, তুলসী, ঘণ্টা ও লোহার নিয়ম।

মন্ত্র না জানলে বা পুরোহিত না পেলে কী করবেন

পুরোহিত এ পূজায় অপরিহার্য নয়; বাড়ির মেয়েরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেরাই কোজাগরী পূজা করে আসছেন। পূর্ণিমার সন্ধ্যায় একসঙ্গে বহু বাড়িতে পূজা হয়, তাই সে রাতে পুরোহিত পাওয়া সব সময় সহজ নয়; তাতে পূজা আটকায় না।

  • সংস্কৃত মন্ত্র না জানলে তার বাংলা অর্থ ভক্তি নিয়ে বলুন। সংস্কৃত ছাড়া করা পূজাও সম্পূর্ণ।
  • অন্তত নামমন্ত্রটি শিখে নিতে পারেন; এটি ছোট, প্রতিটি উপচারের সঙ্গে বলা যায়।
  • কোনো উপকরণ না পেলে যা আছে তা দিয়েই পূজা হয়। যা নেই, তা মনে মনে নিবেদন করুন; মানস পূজাও গ্রহণযোগ্য।
  • বাড়িতে পূজা সম্ভব না হলে কাছের মন্দিরে যোগ দিতে পারেন। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশনসহ ঢাকার অনেক মন্দিরে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা হয়।

প্রশ্নোত্তর

পুরোহিত ছাড়া কি বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো করা যায়?

হ্যাঁ। কোজাগরী মূলত ঘরের স্ত্রী-আচার, পুরোহিত অপরিহার্য নয়। মন্ত্র না জানলে বাংলায় অর্থ বলে ভক্তিভরে পূজা করুন।

লক্ষ্মী পূজা সন্ধ্যায় করব, না মাঝরাতে?

পঞ্জিকা মতে প্রদোষে, সূর্যাস্তের পরের প্রায় দেড় ঘণ্টায়; ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সময়ে সন্ধ্যা ৫টা ৩১ মিনিট থেকে ৭টা ৭ মিনিট (পঞ্জিকার ছাপা ভারতীয় সময়ের সঙ্গে ৩০ মিনিট যোগ করে)। কোনো কোনো পরিবারে মাঝরাতে, নিশীথকালে পূজার রীতি আছে (পারিবারিক রীতি); এ বছর দৃক্‌ গণনায়, বাংলাদেশ সময়ে তা রাত ১১টা ১৭ মিনিট থেকে ১২টা ৮ মিনিট।

কোথাও কোথাও পূজার সময় ভোর পর্যন্ত লেখা দেখা যায়। পঞ্জিকায় পূজা প্রদোষেই; সারা রাত জেগে থাকা পূজার পরের আলাদা রীতি।

লক্ষ্মী পূজায় কি কলা দেওয়া যায়?

যায়। প্রচলিত ঘরোয়া বিধিতে ঘটের ওপর একটি কাঁঠালি কলা অথবা একটি হরীতকী রাখা হয়, নৈবেদ্যের ফলেও কলা থাকে; কোনো শাস্ত্র বা পঞ্জিকায় কলা নিষেধের কথা আমরা পাইনি। পরিবারে কলা না দেওয়ার রীতি থাকলে সেটিও মানতে পারেন।

উপবাস কি করতেই হবে?

না। উপবাস প্রচলিত লোকাচার, বাধ্যতামূলক নয়। যাঁরা রাখেন, তাঁরা পূজার পরে চিঁড়া আর নারকেল বা ডাবের জল খেয়ে উপবাস ভাঙেন।

প্রতিমা বা সরা না থাকলে কি পূজা হবে?

হবে। কোনো একটি রূপ বাধ্যতামূলক নয়; শুধু ঘট পেতে, বা দেবীর ছবি সামনে রেখেও পূজা করা যায়।

কোজাগরী আর প্রতি বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মী পূজায় তফাত কী?

বৃহস্পতিবারের পূজা সাপ্তাহিক, ছোট ঘটপূজা। কোজাগরী বছরে একবার, আশ্বিনের পূর্ণিমায়: সন্ধ্যার পূজার সঙ্গে রাত জাগা, চিঁড়া ও নারকেল, অনেক বাড়িতে সরা বা প্রতিমা আর বড় ভোগ। সাপ্তাহিক পূজার নিয়ম পাবেন প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজার নিয়মে।

এই বিষয়ে আরও পড়ুন

সূত্র

Leave a Comment

Please login to leave a comment.

0 Comments

No comments yet. Be the first to comment!