দেবী লক্ষ্মী হিন্দু ধর্মে ধনসম্পদ, সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য, উর্বরতা এবং আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে পূজিত হন। তিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সহধর্মিণী এবং মহাশক্তি, যিনি মহাবিশ্বের পালন ও স্থিতি বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সনাতন ধর্মে লক্ষ্মী দেবীর রূপ অত্যন্ত মনোরম ও সৌম্য। সাধারণত তাঁকে একটি প্রস্ফুটিত গোলাপি পদ্মফুলের ওপর উপবিষ্ট বা দণ্ডায়মান অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। এই পদ্মফুলটি পবিত্রতা, আধ্যাত্মিক আত্মোপলব্ধি এবং জাগতিক পঙ্কিলতার ঊর্ধ্বে ওঠার প্রতীক, কারণ পদ্ম কাদা জলে জন্মালেও নিজের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখে। দেবীর চার হাত মানবজীবনের চারটি প্রধান পুরুষার্থ বা লক্ষ্যকে নির্দেশ করে, যা হলো—ধর্ম (কর্তব্য ও নীতি), অর্থ (সম্পদ ও সমৃদ্ধি), কাম (কামনা ও প্রেম) এবং মোক্ষ (আধ্যাত্মিক মুক্তি)। তাঁর দুটি হাতে পদ্মকুঁড়ি থাকে, যা সৌন্দর্য ও সৃষ্টির প্রতীক। তৃতীয় হাতটি অভয় মুদ্রায় থাকে, যা ভক্তদের ভয় থেকে মুক্তি ও সুরক্ষা প্রদান করে। চতুর্থ হাতটি বরদা মুদ্রায় থাকে, যেখান থেকে অবিরাম স্বর্ণমুদ্রা বর্ষিত হয়; এটি কেবল জাগতিক ধনসম্পদ নয়, বরং আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ ও করুণারও প্রতীক। দেবীর বাহন হলো পেঁচা, যা অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে সক্ষম। এটি ভক্তদের শেখায় কীভাবে মোহ ও অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলো সন্ধান করতে হয়। দেবী লক্ষ্মী অষ্টলক্ষ্মী রূপে আট প্রকার সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবেও পূজিত হন, যার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, সাহস, জ্ঞান, সন্তান ও বিজয়। বাঙালি হিন্দু পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার অত্যন্ত ভক্তি সহকারে লক্ষ্মী পূজা করা হয়, যা লক্ষ্মীবার নামে পরিচিত। এছাড়া শরৎকালের কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা এবং দীপাবলির রাতে অলক্ষ্মী বিদায় করে মহালক্ষ্মীর পূজা করা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শান্তিময় গৃহে দেবী লক্ষ্মী স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন।
এক নজরে
পরিচয়
বাহন
উলুকা
পূজা ও উপাসনা
প্রধান উৎসব
দিপাবলী
পূজার দিন
বৃহস্পতিবার
পবিত্র ফুল
গোলাপী পদ্ম
পবিত্র রঙ
লাল আর গোলাপী
পরিচিতি
পৌরাণিক কাহিনি
দেবী লক্ষ্মীর পৌরাণিক কাহিনী মহাবিশ্বের ভারসাম্য ও ঐশ্বর্যের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর উৎপত্তি সংক্রান্ত সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনীটি হলো সমুদ্র মন্থন, যা বিভিন্ন পুরাণে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। পৌরাণিক উপাখ্যান অনুসারে, একবার মহর্ষি দুর্বাসা দেবরাজ ইন্দ্রকে একটি পারিজাত ফুলের মালা উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু ইন্দ্র অহংকারবশত সেই মালাটি তাঁর বাহন ঐরাবতের মাথায় রাখলে ঐরাবত সেটি মাটিতে ফেলে পিষে দেয়। এই অবমাননায় ক্রুদ্ধ হয়ে দুর্বাসা মুনি ইন্দ্রসহ সমস্ত দেবকূলকে শ্রীহীন ও ঐশ্বর্যহীন হওয়ার অভিশাপ দেন। অভিশাপের প্রভাবে স্বর্গলোক তার সমস্ত শ্রী, তেজ ও সমৃদ্ধি হারিয়ে ফেলে এবং অসুররা দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গ দখল করে। এই চরম সংকটে দেবতারা ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। ভগবান বিষ্ণু দেবতাদের অসুরদের সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষীরোদ সমুদ্র মন্থন করার পরামর্শ দেন, যাতে সমুদ্র থেকে অমৃত লাভ করে দেবতারা পুনরায় শক্তিশালী হতে পারেন। সমুদ্র মন্থনের সময় মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং বাসুকি নাগকে মন্থনরজ্জু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই মন্থন প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে সমুদ্রের বুক চিরে এক অপূর্ব জ্যোতির্ময়ী দেবীর আবির্ভাব ঘটে, যিনি হলেন দেবী লক্ষ্মী। তিনি একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপর দাঁড়িয়ে আবির্ভূত হন, এবং তাঁর হাতে ছিল পদ্মমালা। দেবীর এই অপরূপ রূপ দেখে দেব, দানব, যক্ষ ও গন্ধর্ব সকলেই মোহিত হন। দেবী লক্ষ্মী তাঁর যোগ্য স্বামী হিসেবে ভগবান বিষ্ণুকে বরণ করে তাঁর গলায় বরমাল্য পরিয়ে দেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি সর্বদা ধর্মের রক্ষক বিষ্ণুর সাথেই শোভা পায়। যখনই ভগবান বিষ্ণু পৃথিবীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন অবতার রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন, দেবী লক্ষ্মীও তাঁর সহধর্মিণী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যেমন—রামাবতারে সীতা, কৃষ্ণের অবতারে রুক্মিণী ও রাধা, এবং পরশুরামের অবতারে ধরণী রূপে তিনি বিষ্ণুর পাশে ছিলেন। এই পৌরাণিক তত্ত্বটি আমাদের শেখায় যে সম্পদ ও শক্তিকে সর্বদা সৎ ও কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করা উচিত।
মন্ত্র
ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে। সর্বতঃ পাহি মাং দেবি মহালক্ষ্মী নমোঽস্তু তে॥
পালনীয় দিন
সম্পর্কিত উৎসব
সম্পর্কিত প্রবন্ধ

দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা ও অলক্ষ্মী বিদায় ২০২৬: নিয়ম, সময় ও কারা করেন
দীপাবলির সন্ধ্যায় দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা, তার আগে অলক্ষ্মী পূজা ও বিদায়। ২০২৬ সালে ২১ কার্তিক, রবিবার (৮ নভেম্বর), বিকেল ৫টা ২৩ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৫৯ মিনিট। অলক্ষ্মী কে, বিদায়ের প্রচলিত নিয়ম, আর কারা এই পূজা করেন।
প্রবন্ধ পড়ুন
লক্ষ্মীর পাঁচালি: বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা সম্পূর্ণ, বারমাস্যাসহ
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মী পূজার পর যে পাঁচালি পড়া হয়, তার সম্পূর্ণ পাঠ: নারদের নিবেদন, অবন্তীর বৃদ্ধা আর বণিকপুত্রের কাহিনি, সঙ্গে শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বারমাস্যা। কখন ও কীভাবে পড়বেন, পাঁচালিতে বলা ব্রতের নিয়ম, গল্পের সংক্ষেপ আর কঠিন শব্দের মানেও আছে।
প্রবন্ধ পড়ুন
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ২০২৬: তারিখ, পূর্ণিমা তিথি ও পূজার সময় (বাংলাদেশ সময়ে)
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ হবে ৭ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার (২৫ অক্টোবর)। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মতে পূর্ণিমা লাগবে সকাল ১১টা ২৯ মিনিটে, পূজা প্রদোষে সন্ধ্যা ৫টা ৩১ মিনিট থেকে ৭টা ৭ মিনিট। পঞ্জিকার ভারতীয় সময়ে ৩০ মিনিট যোগ করে বাংলাদেশ সময় দেওয়া হলো।
প্রবন্ধ পড়ুনএখনো কোনো উত্তর নেই
এই বিষয়ে প্রশ্ন করুন →মন্দির ডিরেক্টরি
লক্ষ্মী-এর মন্দিরসমূহ
লক্ষ্মী-এর সঙ্গে যুক্ত যাচাইকৃত MandirBD মন্দির প্রোফাইল ফিল্টার করুন।


