মূল বিষয়বস্তুতে যান
তথ্য উপাত্ত

লক্ষ্মীর পাঁচালি: বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা সম্পূর্ণ, বারমাস্যাসহ

ববাংলাদেশের মন্দির এডমিন
২২ অক্টোবর ২০২৬
১৩ মিনিট পড়া
০

লক্ষ্মীর পাঁচালি হলো বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীব্রতের কথা, ছন্দে বাঁধা একটি লোককাহিনি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মী পূজার প্রণামের পর একজন পাঁচালি পড়েন, বাকিরা হাতে দূর্বা নিয়ে শোনেন। নিচে পুরো পাঁচালি দেওয়া হলো, সঙ্গে শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বারমাস্যা। পাঠের আগে আছে কখন ও কীভাবে পড়বেন, গল্পের সংক্ষেপ, আর পাঠের পরে কঠিন শব্দের মানে।

বাংলায় পাঁচালি বলতে বোঝায় সুর করে কাহিনি শোনানোর একটি পুরোনো লোকধারা। লক্ষ্মীর এই পাঁচালি দুই লাইন করে মিল রেখে পয়ার ছন্দে লেখা, মোট ২৩২ লাইন। এর লেখকের নাম জানা যায় না; মুখে মুখে আর ছাপা বইয়ে বহু দিন ধরে চলে আসছে, তাই বইভেদে দু-একটি শব্দে তফাত পাবেন।

লক্ষ্মীর পাঁচালি কখন ও কীভাবে পড়বেন

পাঁচালিতেই নারায়ণ লক্ষ্মীকে বলছেন, গুরুবারে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবারে, সন্ধ্যায় পূজা করে ব্রতকথা শুনতে হবে। সেই মতে:

  • কখন: বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, মূল পূজা আর প্রণাম শেষ হলে। পূজার ধাপগুলো আছে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজার নিয়ম লেখায়, আর মন্ত্রগুলো অর্থসহ লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র অর্থসহ লেখায়।
  • কে পড়বেন: একজন পড়েন, বাকিরা মন দিয়ে শোনেন। পাঁচালিতে ব্রতকথা শোনার কথাই বারবার এসেছে।
  • হাতে দূর্বা: যাঁরা শোনেন, তাঁরা হাতে দূর্বা রাখেন। পাঁচালির কথায়, "দূর্বা লয়ে হাতে সবে কথা যে শুনিবে"।
  • মনে ধ্যান: শোনার সময় মনে লক্ষ্মীর মূর্তি ভাবতে বলা হয়েছে।
  • শেষে: পাঠ শেষে প্রণাম, তারপর এয়োরা, অর্থাৎ সধবা মহিলারা, সিঁদুর পরান। অনেক ঘরে এরপর শাঁখ বাজানো ও উলু দেওয়া হয় (প্রচলিত লোকাচার)।
  • কতক্ষণ লাগে: ধীরে, সুর করে পড়লে মোটামুটি ১৫ থেকে ২০ মিনিট।

পাঁচালিতে ব্রতের যে নিয়ম বলা আছে

বনের মধ্যে বৃদ্ধাকে লক্ষ্মী নিজেই ব্রতের নিয়ম শিখিয়ে দেন। পাঁচালি অনুযায়ী:

  • বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়ির বউদের নিয়ে একসঙ্গে ব্রত করা।
  • জলভরা ঘটে সিঁদুরের ফোঁটা দেওয়া, আর ঘটে একটি আমের শাখা রাখা।
  • পান-সুপারি দিয়ে দেবীর আসন সাজানো, সিঁদুর গুলে দেওয়া।
  • ধূপ-দীপ জ্বালানো।
  • বৃহস্পতিবারে পূর্ণিমা পড়লে উপবাস রেখে ব্রত করা।
  • বারো মাস নিয়মিত পূজা: যে ঘরে সারা বছর পূজা হয়, পাঁচালির কথায় সেখানে লক্ষ্মী অচলা হয়ে থাকেন।
  • লক্ষ্মীর হাঁড়ি: ঘরে একটি হাঁড়ি রেখে রোজ এক মুঠো চাল জমানো, যা অসময়ে কাজে আসে।

এর বাইরে ঘণ্টা না বাজানো বা লক্ষ্মীকে তুলসী না দেওয়ার মতো যে নিয়মগুলো শোনা যায়, তার কোনটা শাস্ত্রীয় আর কোনটা লোকাচার, তা আছে লক্ষ্মী পূজায় কলা লাগে না কেন লেখায়।

লক্ষ্মীর পাঁচালির গল্প সংক্ষেপে

পাঁচালির গল্প তিন ভাগে।

  1. নারদের নিবেদন: দোলপূর্ণিমার রাতে নারায়ণের পাশে বসে আছেন লক্ষ্মী। নারদ এসে জানান, মর্ত্যের মানুষ অভাব, রোগ আর অকালমৃত্যুতে কষ্ট পাচ্ছে। লক্ষ্মী বলেন, লোভ, হিংসা, আলস্য, কলহ আর মিথ্যায় ঘর ভরে গেছে বলেই তিনি সেখানে থাকতে পারেন না; যে ঘরে সদাচার, সেখানেই তাঁর বাস। নারায়ণের কথায় তিনি মর্ত্যে বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীব্রত প্রচার করতে অবন্তী নগরে আসেন।
  2. অবন্তীর বৃদ্ধা: নগরপ্রধান ধনেশ্বর রায়ের মৃত্যুর পর বউদের কলহে তাঁর সাত ছেলের সংসার আলাদা হয়ে যায়, আর সেই ঘর ছেড়ে লক্ষ্মী চলে যান। বউদের অত্যাচারে ধনেশ্বরের বিধবা স্ত্রী প্রাণ দিতে বনে যান। ছদ্মবেশে লক্ষ্মী এসে তাঁকে বলেন, আত্মহত্যা মহাপাপ; ঘরে ফিরে বউদের নিয়ে বৃহস্পতিবারের ব্রত করতে বলেন, আর নিজের রূপে দেখা দেন। ব্রতের ফলে সাত ভাই আবার এক হয়, ঘরে লক্ষ্মী ফেরেন। সেই ব্রতকথা শুনে আরেক নারী ব্রত করলে তাঁর কুষ্ঠরোগী স্বামী সেরে ওঠেন।
  3. বণিকপুত্রের অহংকার: শ্রীনগরের এক বণিকপুত্র অবন্তীতে মেয়েদের ব্রত দেখে উপহাস করেন: ভাগ্যে না থাকলে লক্ষ্মী কী দেবেন। এর পর তাঁর বাণিজ্যের নৌকা ডোবে, বাজ পড়ে প্রাসাদ ছারখার হয়, তিনি ভিক্ষা করে ঘুরতে থাকেন। দেবীর কৌশলে ভিক্ষা করতে করতে আবার অবন্তীতে এসে ব্রত দেখে তিনি নিজের ভুল বোঝেন আর লক্ষ্মীর স্তব করেন। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে সব বলেন, ঘরের মেয়েরা লক্ষ্মীপূজা করেন, আর ডুবে যাওয়া সাতটি নৌকা জল থেকে ভেসে ওঠে।

গল্পের কথা সহজ: ঘরে শান্তি, একতা আর সদাচার থাকলে লক্ষ্মী থাকেন; অহংকার, হিংসা আর কলহে তিনি চলে যান।

বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীর পাঁচালি: সম্পূর্ণ পাঠ

পড়ার সুবিধার জন্য পাঠটি তিন ভাগে ভাগ করে ছোট শিরোনাম দেওয়া হয়েছে; শিরোনামগুলো মূল পাঁচালির অংশ নয়।

বৃহস্পতিবারবিহিত শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালি

নারদের নিবেদন ও নারায়ণের উপদেশ

দোলপূর্ণিমা নিশীথে নির্মল আকাশ।
মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।।

লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ।
কহিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন।।

হেনকালে বীণাযন্ত্রে হরি গুণগান।
উপনীত হইলেন নারদ ধীমান।।

ধীরে ধীরে উভপদে করিয়া প্রণতি।
অতঃপর কহিলেন লক্ষ্মীদেবী প্রতি।।

শুন গো, মা নারায়ণি, চলো মর্ত্যপুরে।
তব আচরণে দুখ পাইনু অন্তরে।।

তব কৃপা বঞ্চিত হইয়া নরনারী।
ভুঞ্জিছে দুর্গতি কত বর্ণিবারে নারি।।

সতত কুকর্মে রত রহিয়া তাহারা।
দুর্ভিক্ষ অকালমৃত্যু রোগে শোকে সারা।।

অন্নাভাবে শীর্ণকায় রোগে মৃতপ্রায়।
আত্মহত্যা কেহ বা করিছে ঠেকে দায়।।

কেহ কেহ প্রাণাধিক পুত্রকন্যা সবে।
বেচে খায় হায় হায় অন্নের অভাবে।।

অন্নপূর্ণা অন্নরূপা ত্রিলোকজননী।
বল দেবি, তবু কেন হাহাকার শুনি।।

কেন লোকে লক্ষ্মীহীন সম্পদ অভাবে।
কেন লোকে লক্ষ্মীছাড়া কুকর্ম প্রভাবে।।

শুনিয়া নারদবাক্য লক্ষ্মী ঠাকুরানি।
সঘনে নিঃশ্বাস ত্যজি কহে মৃদুবাণী।।

সত্য বাছা, ইহা বড় দুঃখের বিষয়।
কারণ ইহার যাহা শোনো সমুদয়।।

আমি লক্ষ্মী কারো তরে নাহি করি রোষ।
মর্ত্যবাসী কষ্ট পায় ভুঞ্জি কর্মদোষ।।

মজাইলে অনাচারে সমস্ত সংসার।
কেমনে থাকিব আমি বল নির্বিকার।।

কামক্রোধ লোভ মোহ মদ অহংকার।
আলস্য কলহ মিথ্যা ঘিরিছে সংসার।।

তাহাতে হইয়া আমি ঘোর জ্বালাতন।
হয়েছি চঞ্চলা তাই ওহে বাছাধন।।

পরিপূর্ণ হিংসা দ্বেষ তাদের হৃদয়।
পরশ্রী হেরিয়া চিত্ত কলুষিত ময়।।

রসনার তৃপ্তি হেতু অখাদ্য ভক্ষণ।
ফল তার হেরে ঋষি অকাল মরণ।।

ঘরে ঘরে চলিয়াছে এই অবিচার।
অচলা হইয়া রব কোন সে প্রকার।।

এসব ছাড়িয়া যেবা করে সদাচার।
তার গৃহে চিরদিন বসতি আমার।।

এত শুনি ঋষিবর বলে, নারায়ণি।
অনাথের মাতা তুমি বিঘ্নবিনাশিনী।।

কিবা ভাবে পাবে সবে তোমা পদছায়া।
তুমি না রাখিলে ভক্তে কে করিবে দয়া।।

বিষ্ণুপ্রিয়া পদ্মাসনা ত্রিতাপহারিণী।
চঞ্চলা অচলা হও পাপনিবারণী।।

তোমার পদেতে মা মোর এ মিনতি।
দুখ নাশিবার তব আছে গো শকতি।।

কহ দেবি দয়া করে ইহার বিধান।
দুর্গতি হেরিয়া সব কাঁদে মোর প্রাণ।।

দেবর্ষির বাক্য শুনি কমলা উতলা।
তাহারে আশ্বাস দানে বিদায় করিলা।।

জীবের দুঃখ হেরি কাঁদে মাতৃপ্রাণ।
আমি আশু করিব গো ইহার বিধান।।

নারদ চলিয়া গেলে দেবী ভাবে মনে।
এত দুঃখ এত তাপ ঘুচাব কেমনে।।

তুমি মোরে উপদেশ দাও নারায়ণ।
যাহাতে নরের হয় দুঃখ বিমোচন।।

লক্ষ্মীবাণী শুনি প্রভু কহেন উত্তর।
ব্যথিত কি হেতু প্রিয়া বিকল অন্তর।।

যাহা বলি, শুন সতি, বচন আমার।
মর্ত্যলোকে লক্ষ্মীব্রত করহ প্রচার।।

গুরুবারে সন্ধ্যাকালে যত নারীগণ।
পূজা করি ব্রতকথা করিবে শ্রবণ।।

ধন ধান্য যশ মান বাড়িবে সবার।
অশান্তি ঘুচিয়া হবে সুখের সংসার।।

নারায়ণ বাক্যে লক্ষ্মী হরষ মনেতে।
ব্রত প্রচারণে যান ত্বরিত মর্তেতে।।

উপনীত হন দেবী অবন্তী নগরে।
তথায় হেরেন যাহা স্তম্ভিত অন্তরে।।

অবন্তী নগরে বৃদ্ধার কথা ও ব্রতের নিয়ম

ধনেশ্বর রায় হয় নগর প্রধান।
অতুল ঐশ্বর্য তার কুবের সমান।।

হিংসা দ্বেষ বিজারিত সোনার সংসার।
নির্বিচারে পালিয়াছে পুত্র পরিবার।।

একান্নতে সপ্তপুত্র রাখি ধনেশ্বর।
অবসান নরজন্ম যান লোকান্তর।।

পত্নীর কুচক্রে পড়ি সপ্ত সহোদর।
পৃথগন্ন হল সবে অল্প দিন পর।।

হিংসা দ্বেষ লক্ষ্মী ত্যাজে যত কিছু হয়।
একে একে আসি সবে গৃহে প্রবেশয়।।

এসব দেখিয়া লক্ষ্মী অতি ক্রুদ্ধা হল।
অবিলম্বে সেই গৃহ ত্যজিয়া চলিল।।

বৃদ্ধ রানি মরে হায় নিজ কর্মদোষে।
পুরীতে তিষ্ঠিতে নারে বধূদের রোষে।।

পরান ত্যজিতে যান নিবিড় কাননে।
চলিতে অশক্ত বৃদ্ধা অশ্রু দুনয়নে।।

ছদ্মবেশে লক্ষ্মীদেবী আসি হেন কালে।
উপনীত হইলেন সে ঘোর জঙ্গলে।।

সদয় কমলা তবে জিজ্ঞাসে বৃদ্ধারে।
কিবা হেতু উপনীত এ ঘোর কান্তারে।।

লক্ষ্মীবাক্যে বৃদ্ধা কহে শোন ওগো মাতা।
মন্দভাগ্য পতিহীনা করেছে বিধাতা।।

ধনবান ছিল পিতা মোর পতি আর।
লক্ষ্মী বাঁধা অঙ্গনেতে সতত আমার।।

সোনার সংসার মোর ছিল চারিভিতে।
পুত্র পুত্রবধূ ছিল আমারে সেবিতে।।

পতি হল স্বর্গবাসী সুখৈশ্বর্য যত।
একে একে যাহা কিছু হল তিরোহিত।।

ভিন্ন ভিন্ন হাঁড়ি সব হয়েছে এখন।
অবিরত বধূ যত করে জ্বালাতন।।

অসহ্য হয়েছে এবে তাদের যন্ত্রণা।
এ জীবন বিসর্জিতে করেছি বাসনা।।

বৃদ্ধা বাক্যে নারায়ণী কহেন তখন।
আত্মহত্যা মহাপাপ শাস্ত্রের বচন।।

ফিরে যাও ঘরে তুমি কর লক্ষ্মীব্রত।
সর্ব দুঃখ বিমোচিত পাবে সুখ যত।।

গুরুবারে সন্ধ্যাকালে বধূগণ সাথে।
লক্ষ্মীব্রত কর সবে হরষ মনেতে।।

পূর্ণ ঘটে দিবে শুধু সিঁদুরের ফোঁটা।
আম্রশাখা দিবে তাহে লয়ে এক গোটা।।

গুয়াপান দিবে তাতে আসন সাজায়ে।
সিন্দূর গুলিয়া দিবে ভক্তিযুক্ত হয়ে।।

ধূপ দীপ জ্বালাইয়া সেইখানে দেবে।
দূর্বা লয়ে হাতে সবে কথা যে শুনিবে।।

লক্ষ্মীমূর্তি মানসেতে করিবেক ধ্যান।
ব্রতকথা শ্রবণান্তে শান্ত করে প্রাণ।।

কথা অন্তে ভক্তিভরে প্রণাম করিবে।
অতঃপর এয়োগণ সিঁদুর পরাবে।।

প্রতি গুরুবারে পূজা যে রমণী করে।
নিষ্পাপ হইবে সে কমলার বরে।।

বার মাস পূজা হয় যে গৃহেতে।
অচলা থাকেন লক্ষ্মী সেই সে স্থানেতে।।

পূর্ণিমা উদয় হয় যদি গুরুবারে।
যেই নারী এই ব্রত করে অনাহারে।।

কমলা বাসনা তার পুরান অচিরে।
মহাসুখে থাকে সেই সেই পুত্রপরিবারে।।

লক্ষ্মীর হাঁড়ি এক স্থাপিয়া গৃহেতে।
তণ্ডুল রাখিবে দিন মুঠা প্রমাণেতে।।

এই রূপে নিত্য যেবা সঞ্চয় করিবে।
অসময়ে উপকার তাহার হইবে।।

সেথায় প্রসন্না দেবী কহিলাম সার।
যাও গৃহে ফিরে কর লক্ষ্মীর প্রচার।।

কথা শেষ করে দেবী নিজ মূর্তি ধরে।
বৃদ্ধারে দিলেন দেখা অতি কৃপা ভরে।।

লক্ষ্মী হেরি বৃদ্ধা আনন্দে বিভোর।
ভূমিষ্ঠ প্রণাম করে আকুল অন্তর।।

ব্রত প্রচারিয়া দেবি অদৃশ্য হইল।
আনন্দ হিল্লোলে ভেসে বৃদ্ধা ঘরে গেল।।

বধূগণে আসি বৃদ্ধা বর্ণনা করিল।
যে রূপেতে বনমাঝে দেবীরে হেরিল।।

ব্রতের পদ্ধতি যাহা কহিল সবারে।
নিয়ম যা কিছু লক্ষ্মী বলেছে তাহারে।।

বধূগণ এক হয়ে করে লক্ষ্মীব্রত।
স্বার্থ দ্বেষ হিংসা যত হইল দূরিত।।

ব্রতফলে এক হল সপ্ত সহোদর।
দুঃখ কষ্ট ঘুচে যায় অভাব সত্বর।।

কমলা আসিয়া পুনঃ আসন পাতিল।
লক্ষ্মীহীন সেই গৃহে লক্ষ্মী অধিষ্ঠিল।।

দৈবযোগে একদিন বৃদ্ধার গৃহেতে।
আসিল যে এক নারী ব্রত সময়েতে।।

লক্ষ্মীকথা শুনি মন ভক্তিতে পুরিল।
লক্ষ্মীব্রত করিবে সে মানত করিল।।

কুষ্ঠরোগগ্রস্ত পতি ভিক্ষা করি খায়।
তাহার আরোগ্য আশে পূজে কমলায়।।

ভক্তিভরে এয়ো লয়ে যায় পূজিবারে।
কমলার বরে সব দুঃখ গেল দূরে।।

পতির আরোগ্য হল জন্মিল তনয়।
ঐশ্বর্যে পুরিল তার শান্তির আলয়।।

লক্ষ্মীব্রত এই রূপে প্রতি ঘরে ঘরে।
প্রচারিত হইল যে অবন্তী নগরে।।

বণিকপুত্রের অহংকার ও লক্ষ্মীর কৃপা

অতঃপর শুন এক অপূর্ব ঘটন।
ব্রতের মাহাত্ম্য কিসে হয় প্রচলন।।

একদিন গুরুবারে অবন্তীনগরে।
মিলি সবে এয়োগণ লক্ষ্মীব্রত করে।।

শ্রীনগরবাসী এক বণিক নন্দন।
দৈবযোগে সেই দেশে উপনীত হন।।

লক্ষ্মীপূজা হেরি কহে বণিক তনয়।
কহে, এ কি পূজা কর, কিবা ফল হয়।।

বণিকের কথা শুনি বলে নারীগণ।
লক্ষ্মীব্রত ইহা ইথে মানসপূরণ।।

ভক্তিভরে যেই নর লক্ষ্মীব্রত করে।
মনের আশা তার পুরিবে অচিরে।।

সদাগর এই শুনি বলে অহংকারে।
অভাগী জনেতে হায় পূজে হে উহারে।।

ধনজনসুখ যত সব আছে মোর।
ভোগেতে সদাই আমি রহি নিরন্তর।।

ভাগ্যে না থাকিলে লক্ষ্মী দিবে কিবা ধন।
একথা বিশ্বাস কভু করি না এমন।।

হেন বাক্য নারায়ণী সহিতে না পারে।
অহংকার দোষে দেবী ত্যজিলা তাহারে।।

বৈভবেতে পূর্ণ তরী বাণিজ্যেতে গেলে।
ডুবিল বাণিজ্যতরী সাগরের জলে।।

প্রাসাদ সম্পদ যত ছিল তার।
বজ্র সঙ্গে হয়ে গেল সব ছারখার।।

ভিক্ষাঝুলি স্কন্ধে করি ফিরে দ্বারে দ্বারে।
ক্ষুধার জ্বালায় ঘোরে দেশ দেশান্তরে।।

বণিকের দশা যেই মা লক্ষ্মী দেখিল।
কমলা করুণাময়ী সকলি ভুলিল।।

কৌশল করিয়া দেবী দুঃখ ঘুচাবারে।
ভিক্ষায় পাঠান তারে অবন্তী নগরে।।

হেরি সেথা লক্ষ্মীব্রত রতা নারীগণে।
বিপদ কারণ তার আসিল স্মরণে।।

ভক্তিভরে করজোড়ে হয়ে একমন।
লক্ষ্মীর বন্দনা করে বণিক নন্দন।।

ক্ষমা কর মোরে মাগো সর্ব অপরাধ।
তোমারে হেলা করি যত পরমাদ।।

অধম সন্তানে মাগো কর তুমি দয়া।
সন্তান কাঁদিয়া মরে দাও পদছায়া।।

জগৎ জননী তুমি পরমা প্রকৃতি।
জগৎ ঈশ্বরী তবে পূজি নারায়ণী।।

মহালক্ষ্মী মাতা তুমি ত্রিলোক মণ্ডলে।
গৃহলক্ষ্মী তুমি মাগো হও গো ভূতলে।।

রাস অধিষ্ঠাত্রী তুমি দেবী রাসেশ্বরী।
তব অংশভূতা যত পৃথিবীর নারী।।

তুমিই তুলসী গঙ্গা কলুষনাশিনী।
সারদা বিজ্ঞানদাত্রী ত্রিতাপহারিণী।।

স্তব করে এইরূপে ভক্তিযুক্ত মনে।
ভূমেতে পড়িয়া সাধু প্রণমে সে স্থানে।।

ব্রতের মানত করি নিজ গৃহে গেল।
গৃহিণীরে গৃহে গিয়া আদ্যন্ত কহিল।।

সাধু কথা শুনি তবে যত নারীগণ।
ভক্তিভরে করে তারা লক্ষ্মীর পূজন।।

সদয় হলেন লক্ষ্মী তাহার উপরে।
পুনরায় কৃপাদৃষ্টি দেন সদাগরে।।

সপ্ততরী জল হতে ভাসিয়া উঠিল।
আনন্দেতে সকলের অন্তর পুরিল।।

দারিদ্র অভাব দূর হইল তখন।
আবার সংসার হল শান্তি নিকেতন।।

এইরূপে ব্রতকথা মর্ত্যেতে প্রচার।
সদা মনে রেখো সবে লক্ষ্মীব্রত সার।।

এই ব্রত যেই জনে করে এক মনে।
লক্ষ্মীর কৃপায় সেই বাড়ে ধনে জনে।।

করজোড় করি সবে ভক্তিযুক্ত মনে।
লক্ষ্মীরে প্রণাম কর যে থাক যেখানে।।

ব্রতকথা যেবা পড়ে যেবা রাখে ঘরে।
লক্ষ্মীর কৃপায় তার মনোবাঞ্ছা পুরে।।

লক্ষ্মীর ব্রতের কথা বড়ো মধুময়।
প্রণাম করিয়া যাও যে যার আলয়।।

লক্ষ্মীব্রতকথা হেথা হৈল সমাপন।
আনন্দ অন্তরে বল লক্ষ্মী-নারায়ণ।।

শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বারমাস্যা

বারমাস্যা মানে বারো মাসের ছড়া। বৈশাখ থেকে চৈত্র, প্রতিটি মাসের ছবি এঁকে দেবীকে ঘরে আসতে ডাকা হয়েছে। পাঁচালি শেষ হলে চাইলে এটিও পড়তে পারেন।

বছরের প্রথম মাস বৈশাখ যে হয়।
পূজা নিতে এস ওমা আমার আলয়।।

জ্যৈষ্ঠ মাসে ষষ্ঠী পূজা হয় ঘরে ঘরে।
এসো বসো তুমি ওমা পূজার বাসরে।।

আষাঢ়ে আসিতে মাগো নাহি করো দেরি।
পূজা হেতু রাখি মোরা ধান্য দূর্বা ধরি।।

শ্রাবণের ধারা দেখ চারি ধারে পড়ে।
পূজিবারে ও চরণ ভেবেছি অন্তরে।।

ভাদ্র মাসে ভরা নদী কুল বেয়ে যায়।
কৃপা করি এসো মাগো যত শীঘ্র হয়।।

আশ্বিনে অম্বিকা সাথে পূজা আয়োজন।
কোজাগরী রাতে পুনঃ করিব পূজন।।

কার্তিকে কেতকী ফুল চারিধারে ফোটে।
এসো মাগো এসো বসো মোর পাতা ঘটে।।

অঘ্রাণে আমন ধান্যে মাঠ গেছে ভরে।
লক্ষ্মীপূজা করি মোরা অতি যত্ন করে।।

পৌষপার্বণে মাগো মনের সাধেতে।
প্রতি গৃহে লক্ষ্মী পূজি নবান্ন ধানেতে।।

মাঘ মাসে মহালক্ষ্মী মহলেতে রবে।
নব ধান্য দিয়া মোরা পূজা করি সবে।।

ফাল্গুনে ফাগের খেলা চারিধারে হয়।
এসো মাগো বিষ্ণুজায়া পূজিগো তোমায়।।

চৈত্রেতে চাতক সম চাহি তব পানে।
আসিয়া বস ওমা দুঃখিনীর ভবনে।।

লক্ষ্মীদেবী বারমাস্যা হৈল সমাপন।
ভক্তজন মাতা তুমি করহ কল্যাণ।।

পাঁচালির কিছু শব্দের মানে

  • নিশীথে: গভীর রাতে।
  • মলয় বাতাস: দক্ষিণ দিক থেকে আসা মৃদু, সুগন্ধি হাওয়া।
  • ভুঞ্জিছে: ভোগ করছে।
  • ঠেকে দায়: বিপদে পড়ে, উপায় না পেয়ে।
  • চঞ্চলা, অচলা: লক্ষ্মীর দুই রূপ। চঞ্চলা যিনি এক জায়গায় থাকেন না, অচলা যিনি স্থির হয়ে থাকেন।
  • পরশ্রী: অন্যের সম্পদ বা সৌভাগ্য।
  • ত্রিতাপহারিণী: যিনি তিন রকম তাপ, অর্থাৎ আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক দুঃখ দূর করেন।
  • কমলা, নারায়ণী, পদ্মাসনা, বিষ্ণুপ্রিয়া: লক্ষ্মীরই নানা নাম।
  • গুরুবার: বৃহস্পতিবার।
  • একান্নতে: একান্নবর্তী হয়ে, এক হাঁড়িতে।
  • পৃথগন্ন: আলাদা হাঁড়ি; যৌথ সংসার ভেঙে আলাদা রান্না।
  • কান্তার: গভীর বন।
  • গুয়াপান: সুপারি আর পান।
  • আম্রশাখা: আমের ডাল, আমপল্লব।
  • এয়ো, এয়োগণ: সধবা মহিলারা।
  • তণ্ডুল, মুঠা প্রমাণ: চাল, এক মুঠো পরিমাণ।
  • ইথে মানসপূরণ: এতে মনের ইচ্ছা পূরণ হয়।
  • সপ্ততরী: সাতটি বাণিজ্যের নৌকা।
  • পরমাদ: ভুল, প্রমাদ।
  • আদ্যন্ত: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
  • হেথা হৈল সমাপন: এখানে শেষ হলো।
  • অম্বিকা: দেবী দুর্গা; আশ্বিনে দুর্গাপূজার পর কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজা।
  • কেতকী: কেয়া ফুল।
  • নবান্ন: নতুন ধানের অন্ন।
  • ফাগ: আবির।
  • বিষ্ণুজায়া: বিষ্ণুর স্ত্রী, অর্থাৎ লক্ষ্মী।
  • চাতক: লোককথার পাখি, যে কেবল বৃষ্টির জলের আশায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকে; একান্ত প্রতীক্ষার উপমা।

প্রশ্নোত্তর

লক্ষ্মীর পাঁচালি কোন দিন পড়তে হয়?

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, পূজার পরে। পাঁচালিতে নারায়ণ বলছেন, "গুরুবারে সন্ধ্যাকালে যত নারীগণ। পূজা করি ব্রতকথা করিবে শ্রবণ।।"

পুরুষেরা কি লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে পারেন?

পারেন। ব্রত প্রচলিতভাবে বাড়ির মেয়েরা করেন, কিন্তু পাঁচালিতেই আছে, "ভক্তিভরে যেই নর লক্ষ্মীব্রত করে। মনের আশা তার পুরিবে অচিরে।।" শেষেও বলা হয়েছে, যে জন এক মনে এই ব্রত করেন, লক্ষ্মীর কৃপায় তাঁর ধনে-জনে বৃদ্ধি হয়।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় কি এই পাঁচালি পড়া যায়?

কোজাগরী পূজার পরেও ব্রতকথা বা পাঁচালি পড়ার রীতি আছে। কোনো পরিবার এই বৃহস্পতিবারের পাঁচালিই পড়েন, কোনো পরিবার কোজাগরীর আলাদা ব্রতকথা; নিজের পরিবারের রীতি মানুন। ২০২৬ সালে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ৭ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৬)। পূর্ণিমা তিথি আর পূজার সময় পাবেন কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার তারিখ ও সময় লেখায়, আর পূজার পুরো পদ্ধতি কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার নিয়ম ও পদ্ধতি লেখায়।

বৃহস্পতিবারে পূর্ণিমা পড়লে কী করতে হয়?

পাঁচালি বলছে, বৃহস্পতিবারে পূর্ণিমা পড়লে যে নারী উপবাস রেখে এই ব্রত করেন, লক্ষ্মী শিগগির তাঁর মনের ইচ্ছা পূরণ করেন। পূজাবিধির বইয়েও পূর্ণিমাযুক্ত বৃহস্পতিবারে উপবাস করে পূজার নিয়ম লেখা থাকে। শরীর ভালো না থাকলে জোর করে উপবাস করবেন না; বাড়ির প্রবীণ বা পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলে নিন।

পাঁচালির পাঠ বইভেদে আলাদা কেন?

পাঁচালিটি লোকের মুখে মুখে আর নানা প্রকাশকের ছাপা বইয়ে চলে এসেছে, এর লেখকের নাম জানা যায় না। তাই কোথাও একটি শব্দ, কোথাও একটি লাইন আলাদা পাবেন; মূল গল্প মোটামুটি একই। এখানের পাঠ একটি ছাপা পূজাবিধির পুস্তিকা থেকে নেওয়া। ছাপার কয়েকটি স্পষ্ট ভুল (যেমন "এয়োগন", "কুষ্ঠরোগগ্রস্থ", "পৌষপার্বনে") শুধরে দেওয়া হয়েছে; কোনো শব্দ বা লাইন বদলানো হয়নি। আপনার বাড়ির বইয়ের পাঠ আলাদা হলে সেটাই পড়ুন।

পাঁচালি পড়তে না পারলে কী করব?

অন্য কেউ পড়লে হাতে দূর্বা নিয়ে শুনুন; পাঁচালিতে ব্রতকথা শোনার কথাই বলা আছে। একা থাকলে এই পাতা বা বই দেখে নিজে ধীরে পড়ুন। পাঁচালির শেষ দিকে আছে, "ব্রতকথা যেবা পড়ে যেবা রাখে ঘরে। লক্ষ্মীর কৃপায় তার মনোবাঞ্ছা পুরে।।"

এই বিষয়ে আরও পড়ুন

সূত্র

  • প্রচলিত পাঠ: বৃহস্পতিবারবিহিত শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালি এবং শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বারমাস্যা, একটি ছাপা লক্ষ্মীপূজা বিধির পুস্তিকা থেকে; লেখক অজ্ঞাত। একই পুস্তিকায় পূজার পরে দূর্বা হাতে ব্রতকথা শোনা আর পূর্ণিমাযুক্ত বৃহস্পতিবারে উপবাসের নিয়ম।
  • বাংলাপিডিয়া, পাঁচালি (সুর করে কাহিনি শোনানোর লোকধারা): bn.banglapedia.org
  • বাংলাপিডিয়া, লক্ষ্মীপূজা (প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর বিশেষ পূজা): bn.banglapedia.org

নিজের পরিবারের রীতি আলাদা হলে বাড়ির প্রবীণদের বা পুরোহিতের কাছে জেনে নিন।

মতামত দিন

মতামত দিতে লগইন করুন।

0 টি মতামত

কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!