দীপাবলির সন্ধ্যায়, কালী পূজার কয়েক ঘণ্টা আগে, কিছু পরিবারে লক্ষ্মীর পূজা হয়। এর নাম দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা। তার আগে বাড়ির বাইরে হয় অলক্ষ্মী পূজা, তারপর অলক্ষ্মী বিদায়। ২০২৬ সালে এই সন্ধ্যা পঞ্জিকা মতে ২১ কার্তিক, রবিবার (৮ নভেম্বর)।
এই পূজা সব পরিবারে হয় না। যেখানে হয়, সেখানেও নিয়ম এক নয়। তাই এই লেখায় প্রচলিত বিবরণগুলো দেওয়া হলো, আর কোন কথা কোথা থেকে নেওয়া, তা নিচে সূত্রে আছে। আপনার পরিবারের নিয়ম আলাদা হলে সেটাই মানুন।
এক নজরে দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা ২০২৬
দিন: ২১ কার্তিক, রবিবার (৮ নভেম্বর), দীপাবলির সন্ধ্যা
সময়: বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকায় প্রদোষে দীপান্বিতা লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী পূজা, বাংলাদেশ সময়ে বিকেল ৫টা ২৩ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৫৯ মিনিট
অমাবস্যা: দৃক্ গণনায় ৮ নভেম্বর সকাল ১১টা ৫৮ মিনিট থেকে, প্রচলিত গণনায় সকাল ১১টা ১৮ মিনিট থেকে। দুই হিসাবেই সন্ধ্যায় অমাবস্যা থাকে।
ক্রম: আগে অলক্ষ্মী পূজা ও বিদায়, তারপর হাত-পা ধুয়ে লক্ষ্মী পূজা। রাতে কালী পূজা।
দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা কী
বাংলায় লক্ষ্মী পূজার প্রধান দিন আশ্বিনের পূর্ণিমা, কোজাগরী। এ বছর তা হয়ে গেছে ৭ কার্তিক, রবিবার (২৫ অক্টোবর)। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, কোনো কোনো অঞ্চলে দীপান্বিতা অমাবস্যার সন্ধ্যায়ও লক্ষ্মী পূজার রীতি আছে। যে পরিবারে এই পূজা হয়, সেখানে কোজাগরীর পাশাপাশিই হয়, একটির বদলে অন্যটি নয়।
এই রাতে লক্ষ্মী পূজার বিধান পুরোনো। ষোড়শ শতকের স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মী পূজার বিধান দিয়েছিলেন, কালী পূজার কথা বলেননি। দীপাবলির রাতে কালী পূজার প্রচলন বাংলায় তার পরে। সেই ইতিহাস আছে শ্যামা পূজা কী লেখায়।
কারা এই পূজা করেন
কলকাতার সংবাদমাধ্যমের বিবরণে, দীপান্বিতা লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী পূজা বেশি দেখা যায় পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের পরিবারে, যাঁদের চলতি কথায় ঘটি বলা হয়। একই বিবরণ বলছে, পূর্ববঙ্গীয় অনেক পরিবারে এর চল নেই। তাই বাংলাদেশে এই পূজা তুলনায় কম চোখে পড়ে।
তবে বাংলাদেশে একেবারে নেই, তা-ও নয়। লোকসংস্কৃতি নিয়ে এক লেখায় কামিনীকুমার রায়ের উদ্ধৃতি আছে: ভাগীরথী অঞ্চলের পাশাপাশি যশোর ও খুলনা জেলার গৃহিণীরাও লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী পূজা করেন। আর বাংলাপিডিয়া লিখেছে, কোনো কোনো স্থানে এই রাতে লক্ষ্মী পূজা হয় এবং নানা বাদ্য বাজিয়ে অলক্ষ্মী বিদায় করা হয়।
অলক্ষ্মী কে
লক্ষ্মীর বিপরীত: লক্ষ্মী সৌভাগ্য আর সমৃদ্ধির দেবী। অলক্ষ্মী তার উল্টো: দারিদ্র্য আর দুর্ভাগ্যের।
লক্ষ্মীর বড় বোন: অলক্ষ্মীকে লক্ষ্মীর বড় বোন বলা হয়। শাস্ত্রে তাঁর আরেক নাম জ্যেষ্ঠা, মানে বড়।
জন্মের কাহিনি: এক কাহিনিতে সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মীর ঠিক আগে অলক্ষ্মী ওঠেন। আরেক কাহিনিতে তাঁর জন্ম মন্থনের কালকূট বিষ থেকে। কাহিনিভেদে কথা আলাদা।
এই বিশ্বাস থেকেই রীতি: লক্ষ্মীকে ঘরে আনার আগে অলক্ষ্মীকে বিদায় করতে হয়। তবে বিদায়ের আগে অলক্ষ্মীকেও পূজা করা হয়, বাড়ির বাইরে।
অলক্ষ্মী বিদায় কীভাবে হয়: প্রচলিত বিবরণ
মূর্তি: গোবর দিয়ে ছোট একটি পুতুল বানানো হয়। এক বিবরণে চোখের জায়গায় দুটি কড়ি আর গায়ে ছেঁড়া চুল। কোথাও কলার পেটো ছোট করে কেটে তার ওপর গোবরের পুতুল।
জায়গা: এই মূর্তি ঘরে আনা হয় না। রাখা হয় উঠানের এক কোণে বা বাড়ির বাইরে।
পূজা: বাঁ হাতে ফুল নিয়ে পূজা করা হয়। কোনো কোনো বিবরণে নীল রঙের ফুল।
বিদায়: কুলো বাজাতে বাজাতে মূর্তি বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। কোথাও পাটকাঠির মশাল জ্বেলে তিন রাস্তার মোড়ে বা জলার ধারে রেখে আসা হয়।
তারপর: হাত-পা ভালো করে ধুয়ে ঘরে ফিরে লক্ষ্মী পূজা।
শব্দ করে অলক্ষ্মী তাড়ানোর কথা পুরোনো শাস্ত্রেও আছে। ভবিষ্যোত্তর পুরাণের একটি উদ্ধৃতিতে কুলো আর ঢাক বাজিয়ে অলক্ষ্মী তাড়ানোর বিধান পাওয়া যায়।
"লক্ষ্মী আয়, অলক্ষ্মী যা"
অলক্ষ্মী বিদায়ের সময় বাড়ির সবাই মিলে বলেন: "লক্ষ্মী আয়, অলক্ষ্মী যা"। এই কথাটি একাধিক বিবরণে হুবহু এক। কোনো কোনো পরিবারে কথাগুলো একটু আলাদা, যেমন লক্ষ্মীকে ঘরে আসতে বলা আর অলক্ষ্মীকে দূরে যেতে বলা।
অলক্ষ্মী পূজার সংস্কৃত মন্ত্র পরিবার আর পুঁথিভেদে আলাদা। দুটি আলাদা সূত্রে হুবহু মেলে এমন কোনো মন্ত্র আমরা পাইনি, তাই এখানে কোনো মন্ত্র দেওয়া হলো না। মন্ত্রের জন্য পরিবারের পুঁথি বা পুরোহিতের কথা মেনে চলুন।
লক্ষ্মী পূজা
অলক্ষ্মী বিদায়ের পর লক্ষ্মী পূজা হয় পরিবারের প্রথা মেনে। লক্ষ্মী পূজার সাধারণ নিয়ম, উপকরণ আর মন্ত্র নিয়ে আমাদের আগের লেখাগুলো:
একই সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে দীপাবলির প্রদীপ জ্বলে, আর রাতে কালী পূজা। দীপাবলির পুরো সময়সূচি আছে দীপাবলি ২০২৬ কবে লেখায়।
আপনার পরিবারে কি অলক্ষ্মী বিদায় হয়?
বাংলাদেশের কোন কোন জেলায় এই পূজা হয়, তার নির্ভরযোগ্য কোনো তালিকা আমরা পাইনি। আপনার বাড়িতে দীপাবলির সন্ধ্যায় লক্ষ্মী পূজা বা অলক্ষ্মী বিদায় হলে মন্তব্যে লিখুন: কোন জেলা, মূর্তি কী দিয়ে বানান, বিদায়ের সময় কী বলেন। আপনাদের লেখা থেকেই এই লেখা আরও ঠিক হবে।
প্রশ্নোত্তর
দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে?
২১ কার্তিক, রবিবার (৮ নভেম্বর), দীপাবলির সন্ধ্যায়। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকায় প্রদোষের সময় বাংলাদেশ সময়ে বিকেল ৫টা ২৩ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৫৯ মিনিট।
অলক্ষ্মী মানে কী?
লক্ষ্মীর বিপরীত, দারিদ্র্য আর দুর্ভাগ্যের দেবী। তাঁকে লক্ষ্মীর বড় বোন বলা হয়, আরেক নাম জ্যেষ্ঠা।
অলক্ষ্মী পূজা কেন করা হয়?
বিশ্বাস, লক্ষ্মীকে ঘরে আনার আগে অলক্ষ্মীকে বিদায় করতে হয়। তাই আগে বাড়ির বাইরে অলক্ষ্মীর পূজা ও বিদায়, তারপর ঘরে লক্ষ্মী পূজা।
অলক্ষ্মী বিদায়ের মন্ত্র কী?
বিদায়ের সময় প্রচলিত কথা "লক্ষ্মী আয়, অলক্ষ্মী যা"। সংস্কৃত মন্ত্র পরিবারভেদে আলাদা। দুটি সূত্রে মেলে এমন মন্ত্র না পাওয়ায় এখানে দেওয়া হয়নি।
কোজাগরী আর দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা কি আলাদা?
হ্যাঁ। কোজাগরী হয় আশ্বিনের পূর্ণিমায়, দুর্গা পূজার পরে। দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা হয় কার্তিকের অমাবস্যায়, দীপাবলির সন্ধ্যায়। যে পরিবারে দীপান্বিতা পূজা হয়, সেখানে দুটোই হয়।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
সূত্র
প্রদোষের সময় ও বিধান: বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা ১৪৩৩, পৃ. ২০৮–২০৯ (ছাপা পাতা, ভারতীয় সময়; বাংলাদেশ সময় ৩০ মিনিট যোগ করে)।
দৃক্ গণনায় অমাবস্যা: মন্দিরবিডি পঞ্জিকা, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ (৮ নভেম্বর ২০২৬)।
কোনো কোনো অঞ্চলে দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মী পূজা: বাংলাপিডিয়া, লক্ষ্মীপূজা। নানা বাদ্যে অলক্ষ্মী বিদায়: বাংলাপিডিয়া, দেওয়ালি।
রঘুনন্দনের বিধান: উইকিপিডিয়া, কালীপূজা (হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, তৃতীয় খণ্ড, ২০০৭)।
কারা করেন, কোজাগরীর পাশাপাশি, সমুদ্রমন্থনে অলক্ষ্মী, "লক্ষ্মী আয়, অলক্ষ্মী যা": আজতক বাংলা, ৩০ অক্টোবর ২০২৩।
কলার পেটোর মূর্তি, বাঁ হাতে নীল ফুল, কুলো, পূজার ক্রম: আজতক বাংলা, ১৬ অক্টোবর ২০২৫।
গোবরের মূর্তি, কড়ির চোখ, উঠানের কোণ, "লক্ষ্মী আয়, অলক্ষ্মী যা": উইকিপিডিয়া, অলক্ষ্মী বিদায়।
পাটকাঠির মশাল, তিন রাস্তার মোড়, পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের রীতি: দ্য ওয়াল।
যশোর ও খুলনা (কামিনীকুমার রায়ের উদ্ধৃতি): শ্রীনারায়ণম, বাংলার লক্ষ্মী (ব্লগ, ২০২০)।
জ্যেষ্ঠা ও সমুদ্রমন্থন: উইকিপিডিয়া, Alakshmi; উইকিপিডিয়া, Jyestha। কালকূট বিষ থেকে জন্ম: ইনস্ক্রিপ্ট।
ভবিষ্যোত্তর পুরাণে কুলো ও ঢাক: সাহাপিডিয়া।
মন্দিরবিডি এখন হাতের মুঠোয়
কাছের মন্দির খুঁজুন, পঞ্জিকা পড়ুন, উৎসবের তারিখ হাতের কাছে রাখুন। অ্যান্ড্রয়েডে বিনামূল্যে।
- কাছের মন্দির, সঙ্গে প্রসাদ ও আরতির সময়
- দৈনিক পঞ্জিকা ও উৎসবের বার্তা
- বাংলা ও ইংরেজি — দুই ভাষাতেই
মতামত দিন
মতামত দিতে লগইন করুন।
0 টি মতামত
কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!


