Skip to main content
তথ্য উপাত্ত

লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র অর্থসহ: ধ্যান, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণাম মন্ত্র

দদেব দেবাশীষ
October 14, 2026
11 min read
0

বাড়িতে লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র বলতে সাধারণত পাঁচটি মন্ত্র বোঝায়: ধ্যান মন্ত্র, প্রতিটি উপচারে নামমন্ত্র, পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র, লক্ষ্মী প্রণাম আর নারায়ণ প্রণাম। নিচে প্রতিটি মন্ত্র পড়ার ক্রমে, বাংলা অর্থসহ দেওয়া হলো, সঙ্গে কোজাগরী পূর্ণিমার মূল শাস্ত্রীয় শ্লোকও। সংস্কৃত উচ্চারণ কঠিন লাগলে অর্থটি মনে রেখে ভক্তিভরে বাংলায় বললেও পূজা সম্পূর্ণ বলে মানা হয়।

লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র পড়ার আগে যা জানবেন

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা মূলত স্ত্রী-আচার। পরম্পরায় ঘরের মেয়েরাই এই পূজা করে আসছেন, পুরোহিত না থাকলেও পূজা আটকায় না। সংস্কৃত মন্ত্র জানা থাকলে পড়ুন; না জানলে প্রতিটি ধাপে মন্ত্রের বাংলা অর্থ মনে রেখে বলুন। এটাই প্রচলিত পরামর্শ।

এ বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ৭ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৬)। বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা মতে পূজা প্রদোষে, বাংলাদেশ সময়ে সন্ধ্যা ৫টা ৩১ মিনিট থেকে ৭টা ৭ মিনিট। পঞ্জিকায় সময় ভারতীয় সময়ে ছাপা (বিকেল ৫টা ১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিট); বাংলাদেশ সময়ে ৩০ মিনিট যোগ করে দেওয়া হলো। কলকাতার ছাপা পঞ্জিকা হাতে থাকলে প্রতিটি সময়ের সঙ্গে এভাবেই ৩০ মিনিট যোগ করে নিন।

দুই পঞ্জিকার পূর্ণিমার সময় ও বিস্তারিত হিসাব আছে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ২০২৬-এর সময় নিয়ে লেখায়। আপনার মন্দির বা পরিবার যে পঞ্জিকা মানে, সেই সময় পুরোহিতের কাছে মিলিয়ে নিন।

মন্ত্রগুলো পূজায় এই ক্রমে আসে (বাড়ির প্রচলিত পদ্ধতি; পরিবারভেদে সামান্য আগে-পিছে হতে পারে):

  1. শুদ্ধি: গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল ছিটিয়ে নারায়ণকে স্মরণ, কোনো শ্লোক ছাড়াই।
  2. ঘট বা প্রতিমা সাজানো হলে ধ্যান মন্ত্র।
  3. আবাহন: দেবীকে আসনে আমন্ত্রণ, বাংলায়।
  4. মানস পূজা: মনে মনে দেবীকে সব নিবেদন।
  5. উপচার: পাদ্য, অর্ঘ্য, চন্দন, ফুল, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য; প্রতিটির সঙ্গে নামমন্ত্র।
  6. পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র: এক, তিন বা পাঁচবার।
  7. নারায়ণকে একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা; ইন্দ্র, কুবের ও পেঁচাকে একটি করে ফুল।
  8. দীক্ষিত হলে গুরুমন্ত্র জপ।
  9. লক্ষ্মী প্রণাম ও নারায়ণ প্রণাম।
  10. লক্ষ্মীর ব্রতকথা বা পাঁচালি পাঠ, তারপর শাঁখ ও উলুধ্বনি।

উচ্চারণ নিয়ে কয়েকটি কথা:

  • ধীরে, স্পষ্ট করে পড়ুন। তাড়াতাড়ি পড়ার চেয়ে মন দিয়ে পড়া বেশি জরুরি।
  • “ওঁ” পড়ুন “ওম্”।
  • একক দাঁড়ি (।) মানে অর্ধেক শ্লোক শেষ, জোড়া দাঁড়ি (॥) মানে পুরো শ্লোক শেষ। দাঁড়িতে একটু থামুন।
  • বিসর্গ (ঃ) থাকলে শব্দের শেষে হালকা “হ”-এর মতো শ্বাস ছাড়ুন।
  • প্রণাম মন্ত্রের “নমোঽস্তু” শব্দে ঽ চিহ্নটির নাম অবগ্রহ। এটি বোঝায়, সেখানে একটি “অ” লোপ পেয়েছে; পড়ুন “নমোস্তু”।
  • লম্বা সমাসবদ্ধ শব্দ ছোট ছোট ভাগে ভেঙে পড়ুন। মুখস্থ না থাকলে বই বা এই পাতা দেখে পড়ুন।

শুদ্ধি: শ্লোক ছাড়াই যেভাবে করবেন

পূজার আগে স্নান করে পরিষ্কার কাপড় পরুন, ঘর ও পূজার জায়গা পরিষ্কার করে নিন। তারপর আসনে বসে গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল মাথায় ও আসনে ছিটিয়ে নারায়ণকে স্মরণ করুন।

শুদ্ধির জন্য এখানে কোনো সংস্কৃত শ্লোক দেওয়া হলো না। পুরোহিত বা পরিবারের বই থেকে কোনো মন্ত্র জানা থাকলে সেটি বলতে পারেন; না জানলে নারায়ণকে স্মরণ করে শান্ত মনে পূজায় বসুন। এটি বাড়ির প্রচলিত পদ্ধতি, বাড়িভেদে রীতি আলাদা হতে পারে।

লক্ষ্মী পূজার ধ্যান মন্ত্র ও অর্থ

ধ্যান মানে দেবীর রূপ মনে আনা। ঘট বা প্রতিমার সামনে বসে শান্ত মনে এই মন্ত্র পড়ুন। এটি বাংলা পূজাপদ্ধতিতে প্রচলিত লক্ষ্মীর ধ্যান।

ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজসৃণিভির্যাম্যসৌম্যয়োঃ।

পদ্মাসনস্থাং ধ্যায়েচ্চ শ্রিয়ং ত্রৈলোক্যমাতরম্॥

গৌরবর্ণাং সুরূপাঞ্চ সর্বালঙ্কারভূষিতাম্।

রৌক্মপদ্মব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণেন তু॥

অর্থ: ডান দিকের দুই হাতে পাশ ও অক্ষমালা, বাঁ দিকের দুই হাতে পদ্ম ও অঙ্কুশ; পদ্মাসনে বসা ত্রিলোকের মা শ্রীর ধ্যান করি। তিনি গৌরবর্ণা, সুন্দরী, সব অলংকারে সাজানো; হাতে সোনার পদ্ম, ডান হাতে বর দেন।

কয়েকটি শব্দের মানে: যাম্য মানে ডান, সৌম্য মানে বাঁ; অম্ভোজ পদ্ম, সৃণি অঙ্কুশ; রৌক্ম মানে সোনার। শ্রী লক্ষ্মীরই আরেক নাম।

মন্ত্র পড়তে না পারলে চোখ বুজে দেবীর এই রূপটি মনে আনুন: পদ্মের ওপর বসা গৌরবর্ণা দেবী, সব অলংকারে সাজানো, হাতে সোনার পদ্ম, ডান হাতে বর দিচ্ছেন। এটুকুই ধ্যান।

আবাহন: দেবীকে বাংলায় আমন্ত্রণ

আবাহন মানে দেবীকে ঘরে ও আসনে আমন্ত্রণ জানানো। ধ্যানের পরে হাত জোড় করে বলুন:

“মা লক্ষ্মী, আমার ঘরে এসো, এই আসনে অধিষ্ঠান করো, পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকো, আমার পূজা গ্রহণ করো।”

সংস্কৃত আবাহন মন্ত্রটি শুরু হয় “ওঁ লক্ষ্মীদেবি ইহাগচ্ছ…” দিয়ে। অনলাইনে এর যে রূপগুলো ঘুরছে, সেগুলোতে নানা অশুদ্ধি চোখে পড়ে, তাই পুরো সংস্কৃত পাঠ এখানে দেওয়া হলো না। সংস্কৃতে বলতে চাইলে ছাপা পুরোহিত দর্পণ দেখে পড়ুন; নয়তো ওপরের বাংলা আমন্ত্রণই ভক্তিভরে বলুন।

আবাহনের পরে মানস পূজা: চোখ বুজে মনে মনে দেবীকে আসন, জল, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদন করুন। কোনো উপকরণ হাতের কাছে না থাকলে যা আছে তা দিয়েই পূজা হয়, আর মনে মনে নিবেদনও গ্রহণযোগ্য বলে মানা হয়।

নামমন্ত্র: প্রতিটি উপচারে যা বলবেন

উপচার মানে দেবীকে যা যা নিবেদন করা হয়। প্রতিটি উপচার দেওয়ার সময় এই ছোট মন্ত্রটি বলুন:

ওঁ শ্রীং লক্ষ্মীদেব্যৈ নমঃ

অর্থ: দেবী লক্ষ্মীকে প্রণাম।

উপচারের সাধারণ ক্রম:

  • পাদ্য: ঘটের পাশে আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপে একটু জল।
  • অর্ঘ্য: আতপ চাল ও দূর্বা।
  • তারপর: চন্দন, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য, একটির পর একটি।

সময় বা উপকরণ কম থাকলে পঞ্চোপচারে পূজা করুন: গন্ধ (চন্দন), পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য। দশোপচার ও ষোড়শোপচার আরও বিস্তৃত পদ্ধতি। যে পদ্ধতিই হোক, প্রতিটি উপচারের সঙ্গে নামমন্ত্র একই।

লক্ষ্মী পূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র অর্থসহ

উপচারের পরে পুষ্পাঞ্জলি। দুই হাত জোড় করে চন্দনমাখা ফুল নিন, মন্ত্র শেষ হলে ফুলগুলো দেবীর পায়ে বা ঘটের সামনে দিন।

ওঁ নমস্তে সর্বদেবানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।

যা গতিস্ত্বৎপ্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্ত্বদর্চনাৎ॥

এষ সচন্দনপুষ্পাঞ্জলিঃ ওঁ শ্রীং লক্ষ্মীদেব্যৈ নমঃ॥

অর্থ: হে হরিপ্রিয়া, তুমি সব দেবতাকে বর দাও, তোমায় প্রণাম। যারা তোমার শরণ নেয় তারা যে গতি পায়, তোমার পূজায় আমারও যেন তা-ই হয়। এই চন্দনমাখা ফুলের অঞ্জলি দেবী লক্ষ্মীকে নিবেদন করি।

  • কতবার: এক, তিন বা পাঁচবার। পরিবারে যে রীতি, সেটাই মানুন। প্রতিবার নতুন করে ফুল নিন।
  • হাতে কী রাখবেন: চন্দন মাখানো ফুল; মন্ত্রের শেষ অংশে এই চন্দনমাখা ফুলের কথাই আছে। অন্য একটি প্রচলিত পাঠে বেলপাতার উল্লেখও আছে (নিচে পাঠভেদ দেখুন)।
  • তুলসী নয়: লক্ষ্মীকে তুলসী দেওয়া হয় না, তাই অঞ্জলির ফুলে তুলসী মেশাবেন না; তুলসী নারায়ণের জন্য রাখুন। এটি প্রচলিত লোকাচার।
  • সবাই মিলে: বাড়ির সবাই একসঙ্গে অঞ্জলি দিতে পারেন। একজন ধীরে পড়েন, বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে বলেন।

লক্ষ্মী প্রণাম মন্ত্র ও অর্থ

পূজা ও অঞ্জলির শেষে হাত জোড় করে, বা মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, দেবীকে প্রণাম করুন।

ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।

সর্বতঃ পাহি মাং দেবি মহালক্ষ্মি নমোঽস্তু তে॥

অর্থ: হে পদ্মা, পদ্মে যাঁর বাস, হে শুভা, তুমি বিশ্বরূপ বিষ্ণুর পত্নী। হে দেবী, সব দিক থেকে আমাকে রক্ষা করো; মহালক্ষ্মী, তোমাকে প্রণাম।

প্রণামের পরে লক্ষ্মীর ব্রতকথা বা পাঁচালী পাঠ, তারপর শাঁখ বাজানো ও উলুধ্বনি। লক্ষ্মী পূজায় ঘণ্টা বা কাঁসর বাজানো হয় না। এটি প্রচলিত লোকাচার; এর পক্ষে কোনো শাস্ত্রীয় সূত্র আমরা পাইনি। এ নিয়ে বিস্তারিত আছে কলা, তুলসী, ঘণ্টা ও লোহার নিয়ম নিয়ে লেখায়।

নারায়ণ প্রণাম মন্ত্র

লক্ষ্মীর প্রণাম মন্ত্রেই তাঁকে বিশ্বরূপ বিষ্ণুর পত্নী বলা হয়েছে। তাই লক্ষ্মী পূজায় নারায়ণকেও একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা দিয়ে প্রণাম করা হয়। নিচের প্রণাম মন্ত্রটি বিষ্ণুপুরাণের (১.১৯.৬৫)।

নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণহিতায় চ।

জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ॥

অর্থ: ব্রাহ্মণ্যদেব, গো ও ব্রাহ্মণের কল্যাণকারী, জগতের হিতকারী কৃষ্ণ গোবিন্দকে বারবার প্রণাম।

তুলসী লক্ষ্মীর ঘটে নয়, নারায়ণকে দেওয়া হয়। এর পেছনে একটি প্রচলিত বিশ্বাস আছে: পুরাণের কিছু গল্পে তুলসী ও লক্ষ্মী প্রতিদ্বন্দ্বী। নিয়মটি প্রচলিত লোকাচার।

ইন্দ্র ও কুবেরকে একটি করে ফুল দিন, দেবীর বাহন পেঁচাকেও একটি ফুল। তাঁদের আলাদা মন্ত্র জানা না থাকলে নাম স্মরণ করে ফুল দিন। এটিও বাড়ির প্রচলিত পদ্ধতি।

লক্ষ্মী গায়ত্রী মন্ত্র (ঐচ্ছিক)

এই মন্ত্র পূজার আবশ্যিক অংশ নয়; কেউ চাইলে জপ করেন। মন্ত্রটি শ্রীসূক্তের খিল অংশে পাওয়া যায়, আর পণ্ডিতদের মতে এটি পরবর্তী কালের সংযোজন।

ওঁ মহালক্ষ্ম্যৈ চ বিদ্মহে বিষ্ণুপত্ন্যৈ চ ধীমহি।

তন্নো লক্ষ্মীঃ প্রচোদয়াৎ॥

অর্থ: মহালক্ষ্মীকে জানি, বিষ্ণুপত্নীর ধ্যান করি; সেই লক্ষ্মী আমাদের প্রেরণা দিন।

জপের সংখ্যা নিয়ে কোনো বাঁধা নিয়ম এখানে দেওয়া হলো না; পরিবারের রীতি মানুন। দীক্ষিত হলে প্রণামের আগে নিজের গুরুমন্ত্র জপ করুন, এটি বাড়ির প্রচলিত পদ্ধতি।

শ্রীশ্রীচণ্ডীর লক্ষ্মী স্তুতি

শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্যের পঞ্চম অধ্যায়ের স্তবে দেবীকে নানা রূপে প্রণাম করা হয়েছে। তার একটি শ্লোকে তিনি লক্ষ্মীরূপে। এটি পূজার আবশ্যিক ধাপ নয়, দেবীকে স্মরণের একটি স্তুতি।

যা দেবী সর্বভূতেষু লক্ষ্মীরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥

অর্থ: যে দেবী সব প্রাণীর মধ্যে লক্ষ্মীরূপে আছেন, তাঁকে বারবার প্রণাম।

কোজাগরীর মূল শ্লোক: কে জেগে আছ?

এই শ্লোকগুলো পূজার কোনো ধাপের মন্ত্র নয়; কোজাগরী পূর্ণিমায় রাত জাগা ও লক্ষ্মীপূজার শাস্ত্রীয় ভিত্তি এখানেই। লিঙ্গপুরাণের এই অংশ বাংলার স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন তাঁর তিথ্যাদিতত্ত্বে উদ্ধৃত করেছেন। রাধাকান্ত দেবের শব্দকল্পদ্রুমে “কোজাগর” শব্দের নিচে, আর বোটলিংক ও রোটের সংস্কৃত অভিধানেও এটি ছাপা আছে।

আশ্বিনে পৌর্ণমাস্যাং তু চরেজ্জাগরণং নিশি।

কৌমুদী সা সমাখ্যাতা কার্যা লোকবিভূতয়ে॥

কৌমুদ্যাং পূজয়েল্লক্ষ্মীমিন্দ্রমৈরাবতং স্থিরম্।

সুগন্ধির্নিশি সদ্বেশশ্চাক্ষৈর্জাগরণং চরেৎ॥

নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ কো জাগর্তীতি ভাষিণী।

তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ॥

অর্থ: আশ্বিনের পূর্ণিমায় রাত জেগে থাকতে হয়; এই রাতের নাম কৌমুদী, জগতের মঙ্গলের জন্য এটি পালনীয়। কৌমুদীতে লক্ষ্মী ও ঐরাবতসহ ইন্দ্রের পূজা করবে; সুগন্ধি মেখে, সুন্দর বেশে, অক্ষক্রীড়ায় রাত জাগবে। মাঝরাতে বরদাত্রী লক্ষ্মী বলেন, “কে জেগে আছ?” যে জেগে অক্ষক্রীড়া করে, তাকে আমি ধন দিই।

“কোজাগরী” নামটিও এখান থেকে এসেছে। “কো জাগর্তি” মানে “কে জেগে আছ?” প্রচলিত বিশ্বাস, এই পূর্ণিমার রাতে লক্ষ্মী জানতে চান কে জেগে আছে।

অক্ষক্রীড়া মানে পাশা খেলা। এটি রাত জাগার শাস্ত্রীয় অনুষঙ্গ: পরিবারের মধ্যে আনন্দের জন্য খেলা, কখনো টাকাপয়সা ধরে নয়।

বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকাতেও ৭ কার্তিক (২৫ অক্টোবর) রাতের জন্য কোজাগরকৃত্য ছাপা আছে: নারকেলসহ চিঁড়া খাওয়া, নারকেলের জল পান আর অক্ষক্রীড়ায় রাত জাগা। শব্দকল্পদ্রুমে আরেকটি শ্লোকে নারকেল ও চিঁড়া পিতৃপুরুষ ও দেবতাকে নিবেদন করে, আত্মীয়দের দিয়ে, নিজে খাওয়ার কথা আছে। এগুলো শাস্ত্রীয় ও পঞ্জিকায় ছাপা রীতি।

শ্লোকে লক্ষ্মীর প্রশ্নের সময় মাঝরাত, অর্থাৎ নিশীথ। যাঁরা মাঝরাতেও পূজা বা জপ করেন, তাঁদের জন্য: দৃক্‌ পঞ্চাঙ্গের হিসাবে ঢাকায় নিশীথকাল বাংলাদেশ সময়ে ৭ কার্তিক (২৫ অক্টোবর) রাত ১১টা ১৭ মিনিট থেকে রাত ১২টা ৮ মিনিট (পরদিন)। এটি দৃক্‌ গণনা, বাংলা পঞ্জিকায় ছাপা সময় নয়, তাই এতে ৩০ মিনিট যোগ করতে হবে না। মূল পূজা প্রদোষেই; রাত জাগা আলাদা রীতি।

লক্ষ্মী পূজার মন্ত্রের পাঠভেদ

একই মন্ত্র বিভিন্ন বইয়ে সামান্য আলাদা রূপে পাওয়া যায়। পুষ্পাঞ্জলির শেষ অংশের আরেকটি প্রচলিত রূপে চন্দনের জায়গায় গন্ধ, ফুল ও বেলপাতার উল্লেখ আছে:

এষ সগন্ধপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ শ্রীং লক্ষ্মীদেব্যৈ নমঃ

অর্থ: গন্ধ, ফুল ও বেলপাতার এই অঞ্জলি দেবী লক্ষ্মীকে নিবেদন করি।

আরও কয়েকটি জায়গায় পরিবারভেদে তফাত দেখা যায়:

  • আবাহনের সংস্কৃত পাঠ: অনলাইন কপিতে অশুদ্ধি বেশি, তাই ছাপা পুরোহিত দর্পণ দেখে পড়ুন।
  • উপচার কতটা: পঞ্চোপচার, দশোপচার বা ষোড়শোপচার, যার যেমন রীতি ও সামর্থ্য।
  • বানান: বিসর্গ, হসন্ত বা যুক্তাক্ষরে বইভেদে ছোটখাটো তফাত থাকে; দেবীর নামও কোথাও লক্ষ্মী, কোথাও লক্ষী লেখা হয়। পরিবারের বই বা পুরোহিত যে পাঠ মানেন, সেটিই পড়ুন।

পরিবারে পরম্পরায় যে পাঠ ও রীতি চলে আসছে, ভক্তিভরে সেটিই মেনে চলুন।

প্রশ্নোত্তর

সংস্কৃত মন্ত্র না জানলে কি লক্ষ্মী পূজা হয়?

হয়। প্রচলিত পরামর্শ হলো, মন্ত্রের বাংলা অর্থ ভক্তিভরে বললেই পূজা সম্পূর্ণ। ধ্যানের জায়গায় দেবীর রূপ মনে আনুন, আবাহন বাংলায় করুন, আর প্রতিটি উপচার দেওয়ার সময় মনে মনে দেবীকে প্রণাম জানান।

এ বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা কখন করবেন?

৭ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৬), প্রদোষে। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মতে বাংলাদেশ সময়ে সন্ধ্যা ৫টা ৩১ মিনিট থেকে ৭টা ৭ মিনিট। পঞ্জিকায় সময় ভারতীয় সময়ে ছাপা; বাংলাদেশ সময়ে ৩০ মিনিট যোগ করে দেওয়া হলো।

পুরোহিত ছাড়া বাড়ির মেয়েরা কি মন্ত্র পড়ে পূজা করতে পারেন?

পারেন। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো মূলত স্ত্রী-আচার; পরম্পরায় ঘরের মেয়েরাই এটি করে আসছেন, পুরোহিত আবশ্যিক নয়। পুরো পদ্ধতি ধাপে ধাপে আছে পূজার নিয়ম ও পদ্ধতি নিয়ে লেখায়।

সময় কম থাকলে কোন মন্ত্রগুলো বলবেন?

চোখ বুজে দেবীর রূপ মনে আনুন, তারপর নামমন্ত্র বলে পঞ্চোপচারে পূজা করুন: চন্দন, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য। এরপর একবার পুষ্পাঞ্জলি, নারায়ণকে একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা, আর শেষে লক্ষ্মী প্রণাম। এটুকু দিয়েই ছোট করে পূজা সারা যায়।

পুষ্পাঞ্জলি কতবার দিতে হয়?

এক, তিন বা পাঁচবার। পরিবারভেদে সংখ্যা আলাদা; বাড়িতে যে রীতি, সেটাই মানুন।

আবাহনের সংস্কৃত মন্ত্র এখানে নেই কেন?

অনলাইনে এর যে রূপগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোতে অশুদ্ধি চোখে পড়েছে। ভুল পাঠ ছাপার বদলে আমরা বাংলা আমন্ত্রণ দিয়েছি। সংস্কৃতে বলতে চাইলে ছাপা পুরোহিত দর্পণ দেখে পড়ুন।

কোজাগরী আর বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র কি আলাদা?

নামমন্ত্র, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণাম মন্ত্র দুই পূজাতেই একই। কোজাগরীতে বাড়তি থাকে সন্ধ্যার পূজার পরে রাত জাগা, চিঁড়া-নারকেল খাওয়া আর অক্ষক্রীড়া, যার ভিত্তি ওপরের মূল শ্লোক। সাপ্তাহিক পূজার নিয়ম আছে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজার নিয়ম নিয়ে লেখায়।

এই বিষয়ে আরও পড়ুন

সূত্র

ধ্যান, নামমন্ত্র, পুষ্পাঞ্জলি, প্রণাম ও লক্ষ্মী গায়ত্রী বাংলা পূজাপদ্ধতির প্রচলিত পাঠ; এগুলো আর শ্রীশ্রীচণ্ডীর শ্লোকটি অন্তত দুটি স্বতন্ত্র সূত্রে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রের পাঠ ও পূজার রীতি পরিবারভেদে আলাদা হতে পারে। সংশয় থাকলে নিজের পুরোহিত বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে জেনে নিন।

Leave a Comment

Please login to leave a comment.

0 Comments

No comments yet. Be the first to comment!