মূল বিষয়বস্তুতে যান
← সব মহাপুরুষ
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী

বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী

প্রধান মহাপুরুষ

৫টি আশ্রম/মন্দির|saint

সংক্ষিপ্ত পরিচয়

বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী ছিলেন একজন প্রখ্যাত হিন্দু যোগী, সাধক এবং আধ্যাত্মিক গুরু। দীর্ঘ কয়েক দশক হিমালয়ে কঠোর সাধনা শেষে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদীতে একটি আশ্রম স্থাপন করেন। তাঁর শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সহজ এবং সর্বজনীন। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক কল্যাণে তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

জীবনী

বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১৭৩০ সালের জন্মাষ্টমী তিথিতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার চাকলা বা কচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মাতা কমলা দেবী। তিনি ছিলেন পিতামাতার চতুর্থ সন্তান। পিতা রামনারায়ণ ঘোষালের প্রবল ইচ্ছা ছিল যে, তাঁর একটি সন্তান ব্রহ্মচর্য পালন করে ঈশ্বরের সেবায় জীবন উৎসর্গ করুক। পিতার সেই ঐকান্তিক ইচ্ছা পূরণে মাত্র ১১ বছর বয়সে লোকনাথ তাঁর দীক্ষাগুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায় এবং বাল্যসখা বেণীমাধবের সাথে গৃহত্যাগ করেন।

তাঁরা প্রথমে কলকাতার কালীঘাটে এসে পৌঁছান এবং সেখানে দীর্ঘকাল কঠোর তপস্যা, উপবাস ও ধ্যান করেন। এরপর তাঁরা বারাণসী (কাশী) হয়ে হিমালয়ের অতিশয় দুর্গম ও শীতল অঞ্চলে গমন করেন। সেখানে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁরা অষ্টাঙ্গ যোগ সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। লোকনাথ বাবার অনুসারীদের মতে, তিনি প্রায় ৯০ বছর ধরে পদব্রজে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।

হিমালয়ে সিদ্ধিলাভের পর তিনি সমতলে নেমে আসেন এবং ১৮৬৬ সালের দিকে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদী গ্রামে পদার্পণ করেন। স্থানীয় নাগ জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি সেখানে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাবা লোকনাথ জাতিভেদ, বর্ণপ্রথা বা ধর্মীয় গোঁড়ামিতে একদমই বিশ্বাস করতেন না; তাঁর আশ্রম ধনী-দরিদ্র সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত ছিল। তাঁর একটি বিখ্যাত এবং কালজয়ী অভয়বাণী হলো: "রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।" ১৮৯০ সালের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ তিনি বারদী আশ্রমেই মহাসমাধি লাভ করেন।

বাণী ও উপদেশ

বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী ছিলেন একজন মহান সাধক ও যোগী, যাঁর জীবন ও বাণী আজও অগণিত মানুষকে পথ দেখায়। তাঁর শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা জাতের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল সমগ্র মানবজাতি ও জীবজগতের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। নিচে তাঁর কিছু অমূল্য শিক্ষা ও সমাজদর্শন তুলে ধরা হলো:

১. সর্বজনীন জীবে প্রেম ও ঈশ্বরবোধ

  • বাবা লোকনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি জীবের মধ্যেই পরমেশ্বরের বাস।

  • পশু-পাখি থেকে শুরু করে প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনই হলো প্রকৃত ধর্ম।

  • তিনি শিখিয়েছেন, এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে কাউকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা না করে, সবার প্রতি সমমর্মিতা ও দয়া দেখানোই আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি।

২. দরিদ্র নারায়ণ সেবা (মানবসেবা)

  • সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবা করাকে তিনি ঈশ্বরের সরাসরি সেবা হিসেবে গণ্য করতেন।

  • দানশীলতার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলতেন, "দীন দরিদ্র অসহায় মানুষের হাতে যখন যা দিবি, তা আমিই পাব, আমি গ্রহণ করবো।"

  • নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য তিনি সর্বদা তাঁর অনুসারীদের উৎসাহিত করতেন।

৩. সত্য ও পবিত্রতা

  • বাবা লোকনাথের মতে, "সত্যের মতো পবিত্র আর কিছু নেই।" সত্যবাদিতাকে তিনি জীবনে উন্নতির সবচেয়ে বড় সোপান বলে মনে করতেন।

  • অহংকার ও ক্রোধ মানুষের পতন ডেকে আনে। তাই তিনি সতর্ক করে বলেছেন, "গর্ব করবি কিন্তু আহাম্মক হবি না, ক্রোধ করবি কিন্তু ক্রোধান্ধ হবি না।"

৪. জাগতিক মোহমুক্তি ও আত্মবিচার

  • অর্থ ও সম্পত্তির প্রতি অতিরিক্ত মোহ মানুষকে কেবল কষ্টই দেয়। এই বাস্তব সত্যটি তুলে ধরে তিনি বলতেন, "অর্থ উপার্জন করা, তা রক্ষা করা আর তা ব্যয় করার সময় দুঃখ ভোগ করতে হয়।"

  • জাগতিক আসক্তি কমিয়ে আত্মজ্ঞান লাভ এবং নিজের ভেতরের সত্তাকে চেনার ওপর তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতেন।

৫. পরম নির্ভরতা ও অভয়বাণী

  • ভক্তদের জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় উপহার ছিল তাঁর এই চিরন্তন প্রতিশ্রুতি: "রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়বে, আমাকে স্মরণ করো আমিই রক্ষা করব।"

  • তাঁর শিক্ষা হলো, সম্পূর্ণ ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে ঈশ্বরকে ডাকলে তিনি সবসময় মানুষের পাশে থাকেন এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেন।

অলৌকিক লীলা

  • ১. ভয়ংকর ঝড়ে ভক্তদের রক্ষা: এটি সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত লোকশ্রুতি। একবার বাবার কয়েকজন ভক্ত মাঝনদীতে ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখীন হন। তখন তাঁরা বিপদে স্মরণ করার জন্য বাবার দেওয়া সেই অভয়বাণী মনে করে তাঁকে ডাকেন। বলা হয়, বাবা লোকনাথ বারদীর আশ্রমে থাকা সত্ত্বেও, অলৌকিকভাবে সশরীরে সেই নৌকায় উপস্থিত হয়ে হাল ধরেন এবং সবাইকে নিরাপদে তীরে নিয়ে আসেন।

  • ২. হিমালয়ের বরফে অলৌকিক তপস্যা: লোকশ্রুতি অনুযায়ী, বাবা লোকনাথ হিমালয়ের হাড়-কাঁপানো ঠান্ডায় গায়ে কোনো শীতের পোশাক ছাড়াই বছরের পর বছর তপস্যা করতেন। তাঁর ভেতরের যোগাগ্নির (Inner Heat) এতই প্রবল তেজ ছিল যে, তিনি যেখানে ধ্যান করতে বসতেন, তার চারপাশের জমাট বাঁধা বরফ সম্পূর্ণ গলে যেত।

  • ৩. একই সময়ে একাধিক স্থানে উপস্থিতি: অনেক ভক্ত দাবি করেছেন যে, বাবা লোকনাথ বারদীর আশ্রমে বসে থাকা অবস্থাতেই একই সময়ে বহুদূরের অন্য কোনো শহরে বিপদে পড়া ভক্তদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন এবং তাঁদের রক্ষা করেছেন। আমাদের চেনা লজিক্যাল সিস্টেমে এটা অসম্ভব হলেও, আধ্যাত্মিক জগতে একে উচ্চস্তরের সিদ্ধি বলা হয়।

  • ৪. ১৬০ বছরের দীর্ঘ আয়ু: ১৭৩০ সালে জন্ম এবং ১৮৯০ সালে মহাপ্রয়াণ—এই হিসেব অনুযায়ী তাঁর বয়স হয়েছিল ১৬০ বছর। তবে ভক্তদের কাছে এটি তাঁর দীর্ঘ ব্রহ্মচর্য, প্রাণায়াম ও কঠোর যোগ সাধনার সবচেয়ে বড় এবং জীবন্ত প্রমাণ।

বাণী

“রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়বে, আমাকে স্মরণ করো আমিই রক্ষা করব।”

সম্পর্কিত উৎসব ও তিথি

🛕আশ্রম ও মন্দিরসমূহ৫

খুঁজুন ও ফিল্টার করুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

রাখের উপবাস ২০২৬: তারিখ, পাঁচ দিনের তালিকা ও প্রদীপ জ্বালানোর সময়

রাখের উপবাস ২০২৬: তারিখ, পাঁচ দিনের তালিকা ও প্রদীপ জ্বালানোর সময়

রাখের উপবাস ২০২৬ শুরু ১৬ কার্তিক ১৪৩৩, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর), শেষ ৩০ কার্তিক, মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর)। বারদী আশ্রমের তালিকা অনুযায়ী কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের পাঁচটি মঙ্গল ও শনিবার, নারায়ণগঞ্জে সূর্যাস্তের সময়, আর কখন পৌঁছাবেন।

প্রবন্ধ পড়ুন
রাখের উপবাস পালনের নিয়ম: কিভাবে করতে হয়, উপকরণ ও প্রণাম মন্ত্র

রাখের উপবাস পালনের নিয়ম: কিভাবে করতে হয়, উপকরণ ও প্রণাম মন্ত্র

রাখের উপবাস পালনের নিয়ম ধাপে ধাপে: আগের দিনের সংযম, উপবাসের দিন, উপকরণের তালিকা, সূর্যাস্তে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালানো, নীরব প্রার্থনা, উপবাস ভাঙা আর বাবা লোকনাথের প্রণাম মন্ত্র অর্থসহ। কোনটা আশ্রমের রীতি, কোনটা লোকাচার, তাও আলাদা করে বলা।

প্রবন্ধ পড়ুন
রাখের উপবাস কি এবং কেন করা হয়: বাবা লোকনাথ ও কার্তিক ব্রতের কথা

রাখের উপবাস কি এবং কেন করা হয়: বাবা লোকনাথ ও কার্তিক ব্রতের কথা

রাখের উপবাস বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ভক্তদের কার্তিক ব্রত: কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের প্রতি মঙ্গল ও শনিবার উপবাস রেখে সূর্যাস্তে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রিয়জনের মঙ্গল প্রার্থনা। কেন করা হয়, মহামারি আর শীতলা দেবীর লোককথা, কোন প্রশ্নের লিখিত উত্তর মেলে না, সে কথাও এখানে।

প্রবন্ধ পড়ুন

পরিচয় ও তথ্য

জন্মস্থান

চাকলা, দেগঙ্গা, বসিরহাট, উত্তর চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

আবির্ভাব কাল

1730 – 1890

পিতা-মাতা

রামনারায়ণ ঘোষাল এবং কমলা দেবী

সম্প্রদায়

হিন্দু

উপাসনা

প্রধান উৎসব

শ্রী শ্রী লোকনাথ বাবার তিরোধান উৎসব

প্রিয় ফুল

নীল শাপলা বা নীল শালুক ফুল

প্রিয় রঙ

সাদা

স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিন

আমাদের ডিজিটাল ঐতিহ্য রক্ষায় সাহায্য করুন। আপনার এলাকার মন্দিরের তথ্য, ছবি বা পঞ্জিকা আপডেট করে আমাদের সাথে যুক্ত হোন।

আবেদন করুন