রাখের উপবাস পালন করা হয় কার্তিক মাসের শেষ পনেরো দিনের প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার। নিয়ম সহজ: আগের দিন সংযম, ব্রতের দিন সারাদিন উপবাস, বিকেলে ঘি, মাটির প্রদীপ আর ধূপ নিয়ে বাবা লোকনাথের সামনে সারি বেঁধে বসা, সূর্যাস্তে সবার সঙ্গে একসঙ্গে প্রদীপ জ্বালানো, তারপর নীরবে প্রার্থনা ও প্রণাম। প্রদীপ জ্বলা শেষ হলে উপবাস ভাঙা হয়।
নিচে আগের দিন থেকে উপবাস ভাঙা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ, উপকরণের তালিকা আর বাবা লোকনাথের প্রণাম মন্ত্র অর্থসহ দেওয়া হলো। কোনটা বারদী আশ্রমের রীতি আর কোনটা প্রচলিত লোকাচার, তা আলাদা করে বলা আছে। সব আশ্রমে সব নিয়ম এক নয়; আপনার আশ্রম বা পরিবারের রীতি থাকলে সেটাই আগে মানুন।
রাখের উপবাস কী, সংক্ষেপে
রাখের উপবাস বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীকে ঘিরে পালিত একটি ব্রত। একে কার্তিক ব্রত, গোঁসাইর উপবাস বা ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালনও বলা হয়। সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে, ঢাকায় স্বামীবাগের লোকনাথ আশ্রমেও বহু মানুষ যান।
প্রচলিত বিশ্বাস, কলেরা ও বসন্তের মতো রোগ থেকে রক্ষা পেতে বাবা লোকনাথ ভক্তদের কার্তিক মাসে উপবাস রেখে আশ্রম প্রাঙ্গণে ঘিয়ের প্রদীপ ও ধূপ জ্বালাতে বলেছিলেন। এটি লোকবিশ্বাস, লিখিত ইতিহাস নয়। কাহিনিটি বিস্তারিত পাবেন রাখের উপবাস কি ও কেন করা হয় লেখায়।
রাখের উপবাস কবে পালন করা হয়
কার্তিক মাসের শেষ পনেরো দিনে যতগুলো মঙ্গলবার ও শনিবার পড়ে, প্রতিটিই উপবাসের দিন। মাসটা গোনা হয় পঞ্জিকার কার্তিক ধরে।
২০২৬ সালে দিন পাঁচটি: ১৬ কার্তিক ১৪৩৩, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) থেকে ৩০ কার্তিক, মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) পর্যন্ত। বারদী আশ্রমের নিজের তালিকা আর প্রতিটি দিনের সূর্যাস্তের সময় আছে রাখের উপবাস ২০২৬ তারিখ ও সময় লেখায়।
আগের দিনের সংযম
ব্রতের আগের দিন সংযম করার রীতি আছে (প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারদী আশ্রমের ভক্তদের প্রচলিত নিয়ম)। বাংলার ব্রতে সংযম বলতে সাধারণত বোঝায় নিরামিষ, পরিমিত আহার আর মন শান্ত রাখা। আমিষ, পেঁয়াজ-রসুন বাদ দেওয়ার নিয়ম কোন পরিবার কতটা মানে, তা পারিবারিক রীতির ব্যাপার।
উপবাসের দিন
উপবাসের দিন সকাল থেকে প্রদীপ জ্বালানো পর্যন্ত না খেয়ে থাকা হয়। স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরে দিন শুরু করুন, মনে মনে বাবা লোকনাথকে স্মরণ করুন।
নির্জলা থাকতে হবে কি না, অর্থাৎ জলও না খেয়ে, তার কোনো অভিন্ন বিধান আমরা পাইনি। কেউ নির্জলা থাকেন, কেউ থাকেন না। আপনার আশ্রম বা পরিবারে যে রীতি চলে আসছে, সেটাই মানুন।
রাখের উপবাসের উপকরণ
বারদী আশ্রমের আগের বছরগুলোর প্রতিবেদনে ভক্তদের হাতে এসব জিনিস দেখা যায়। সব আশ্রমে প্রতিটি জিনিস বাধ্যতামূলক কি না, তার একক নিয়ম পাওয়া যায় না; প্রদীপ, ঘি আর ধূপ মূল।
- মাটির প্রদীপ, যতজনের মঙ্গল কামনা করবেন ততটি
- ঘি, প্রদীপ জ্বালানোর জন্য
- তুলোর সলতে
- কলাপাতা বা কলাগাছের খোল, প্রদীপ সাজিয়ে রাখার জন্য
- ধূপ ও আগরবাতি
- ফুল
- ফল
- ধান ও দূর্বা
- ডাব ও দুধ
- দেশলাই, আর বসার জন্য একটি আসন বা চট
কিছু ফল কেটে প্রদীপের চারপাশে সাজিয়ে রাখার রীতিও দেখা যায়।
ধাপে ধাপে: রাখের উপবাস কিভাবে করতে হয়
নিচের ক্রম বারদী আশ্রমে যেমন হয়ে থাকে, প্রতিবেদন আর প্রচলিত বিবরণ মিলিয়ে সাজানো। অন্য আশ্রমে খুঁটিনাটি আলাদা হতে পারে; সেখানকার সেবাইতদের কথা মেনে চলুন।
- আগেভাগে পৌঁছানো: দুপুরের পর থেকেই ভক্তরা আশ্রমে আসতে থাকেন। ভিড়ে বসার জায়গা পেতে বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে পৌঁছানো ভালো। এটি আমাদের পরামর্শ, আশ্রমের ঘোষিত সময় নয়।
- সারি বেঁধে বসা: বাবা লোকনাথের বিগ্রহ বা মন্দিরের দিকে মুখ করে সারি বেঁধে বসুন। পাশের জনের জায়গা রেখে বসুন।
- প্রদীপ সাজানো: কলাপাতা বা কলাগাছের খোলে মাটির প্রদীপ সাজান, প্রতিটিতে ঘি আর সলতে দিন। প্রচলিত রীতি, যতজন প্রিয়জনের মঙ্গল চান, প্রদীপও ততটি। পাশে ফুল, ফল, ধান-দূর্বা রাখুন।
- ধূপ জ্বালানো: ধূপ বা আগরবাতি জ্বালিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করুন।
- সূর্যাস্তে প্রদীপ প্রজ্বালন: সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বাজে, উলুধ্বনি ওঠে, আর সবাই একসঙ্গে প্রদীপ জ্বালান। আশ্রম কোনো ঘড়ির সময় ঘোষণা করে না, সূর্যাস্তই সংকেত। ২০২৬ সালের উপবাসের দিনগুলোতে নারায়ণগঞ্জে (বারদী) সূর্যাস্ত বিকেল ৫টা ১৮ মিনিট (৩ নভেম্বর) থেকে বিকেল ৫টা ১২ মিনিটের (১৭ নভেম্বর) মধ্যে।
- নীরবতা: প্রদীপ জ্বালানোর পর কথা বলা নিষেধ (আশ্রমের রীতি)। একাগ্র মনে বাবা লোকনাথকে ডাকুন, যাঁদের নামে প্রদীপ দিয়েছেন তাঁদের কথা ভাবুন।
- প্রার্থনা ও প্রণাম: বারদীতে প্রার্থনার মাঝে ধর্মগ্রন্থ পাঠ হয়। শেষে প্রণাম মন্ত্র বলে প্রণাম করুন; মন্ত্র নিচে অর্থসহ দেওয়া আছে।
- উপবাস ভাঙা: প্রদীপ জ্বলা শেষ হলে, প্রার্থনা সেরে, উপবাস ভাঙা হয়।
- প্রসাদ: বারদীতে প্রদীপের আলো নিভে এলে মন্দির থেকে চাল-কলা প্রসাদ দেওয়া হয় (প্রতিবেদন অনুযায়ী)। অনেকে এই প্রসাদ মুখে দিয়েই উপবাস ভাঙেন।
বাবা লোকনাথের প্রণাম মন্ত্র অর্থসহ
রাখের উপবাসের জন্য আলাদা কোনো বাধ্যতামূলক মন্ত্র আমরা পাইনি। নিচের দুটি শ্লোক বাবা লোকনাথের প্রণামে বহুল প্রচলিত; প্রতিটি তিনটি আলাদা সূত্রে একইভাবে পাওয়া গেছে। একটি সূত্রে প্রথম শ্লোকটি পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র হিসেবেও দেওয়া আছে।
যোগীন্দ্রায় নমস্তুভ্যং ত্যাগীশ্বরায় বৈ নমঃ।
ভূমানন্দস্বরূপায় লোকনাথায় নমো নমঃ॥
অর্থ: যিনি যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তোমাকে প্রণাম; যিনি ত্যাগীদের ঈশ্বর, তাঁকে প্রণাম। পরম আনন্দ যাঁর স্বরূপ, সেই লোকনাথকে বারবার প্রণাম।
নমস্তে গুরুরূপায় নমস্তে ত্রিকালদর্শিনে।
নমস্তে শিবরূপায় ব্রহ্মাত্মনে নমো নমঃ॥
অর্থ: গুরুরূপে যিনি আছেন, তোমাকে প্রণাম; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যিনি দেখেন, তোমাকে প্রণাম। শিবরূপ, ব্রহ্মস্বরূপ তোমাকে বারবার প্রণাম।
সংস্কৃত শ্লোক না জানলে বাংলায় "জয় বাবা লোকনাথ" বলে ভক্তিভরে প্রণাম করলেও চলে। বাবার জীবন ও উপদেশ নিয়ে পড়তে পারেন বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর পাতায়।
আশ্রমে যেতে না পারলে
পুরোনো প্রতিবেদন বলছে, এখন বহু লোকনাথ মন্দিরেই এই অনুষ্ঠান হয়। তাই বারদী বা স্বামীবাগে যেতে না পারলে কাছের লোকনাথ মন্দিরে খোঁজ নিন, সেখানে কোন দিন কখন আয়োজন।
কেউ কেউ বাড়িতে বাবা লোকনাথের ছবির সামনে একই নিয়মে উপবাস রেখে সূর্যাস্তে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালান। ঘরে পালনের আলাদা কোনো বিধান আমরা পাইনি; আশ্রমের রীতিই মাপকাঠি। বাড়িতে প্রদীপ জ্বাললে আগুন থেকে সাবধান থাকুন, শিশুদের নাগাল থেকে দূরে রাখুন।
কারা পালন করতে পারেন
নারী, পুরুষ, শিশু সবাই একসঙ্গে বসে প্রার্থনায় অংশ নেন (প্রতিবেদন অনুযায়ী)।
বয়স্ক, অসুস্থ বা অন্তঃসত্ত্বা হলে সারাদিনের উপবাস নিজের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। উপবাস প্রচলিত রীতি, সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ওষুধ খেতে হলে বা ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন; শুধু প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনায় বসাও ভক্তিরই অংশ।
প্রশ্নোত্তর
রাখের উপবাসে কয়টা প্রদীপ জ্বালাতে হয়?
নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। প্রচলিত রীতি, যতজন আপনজনের মঙ্গল কামনা করবেন, প্রদীপও ততটি; প্রত্যেকের নামে একটি করে।
ঘি না পেলে কী দিয়ে প্রদীপ জ্বালাব?
এই ব্রতের আরেক নামই ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন, তাই ঘিয়ের প্রদীপই রীতি। অন্য তেল চলবে কি না, তার কোনো বিধান আমরা পাইনি; সম্ভব হলে অল্প হলেও ঘি জোগাড় করুন, না পারলে আপনার আশ্রমের সেবাইতকে জিজ্ঞেস করুন।
উপবাস কখন ভাঙব?
সূর্যাস্তে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা সেরে, প্রদীপ জ্বলা শেষ হলে।
কী খেয়ে উপবাস ভাঙব?
বারদীতে মন্দিরের চাল-কলা প্রসাদ দিয়ে অনেকে উপবাস ভাঙেন। বাড়ি ফিরে হালকা নিরামিষ খাবার খাওয়াই ভালো, সারাদিন না খাওয়ার পর ভারী খাবার শরীরের পক্ষে কষ্টকর হতে পারে।
বাড়িতে কি রাখের উপবাস করা যায়?
কেউ কেউ করেন: উপবাস রেখে সূর্যাস্তে বাবা লোকনাথের ছবির সামনে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা। তবে এর আলাদা বিধান পাওয়া যায় না; সম্ভব হলে কাছের লোকনাথ মন্দিরের আয়োজনে যোগ দিন।
সব কয়টি দিনেই কি উপবাস রাখতে হয়?
এমন কোনো বাধ্যবাধকতার কথা আমরা পাইনি। নিজের সামর্থ্য আর পরিবারের রীতি মেনে ঠিক করুন।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
- রাখের উপবাস ২০২৬: পাঁচ দিনের তারিখ ও সূর্যাস্তের সময়
- রাখের উপবাস কি, কেন করা হয়
- বারদী লোকনাথ আশ্রমে রাখের উপবাস: যাওয়ার পথ ও যা জানবেন
- মন্দিরবিডিতে রাখের উপবাসের পাতা
- বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী
সূত্র
- ২০২৬ সালের পাঁচটি দিন: বারদী শ্রীশ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমের ফেসবুক পাতা, "১৪৩৩ বাংলা কার্তিক মাসের রাখের উপবাসের তালিকা" (২৪ অক্টোবর ২০২৬); মন্দিরবিডি পঞ্জিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
- দিন, প্রধান দুই কেন্দ্র ও নানা নাম: প্রথম আলো (২০২২)।
- আগের দিনের সংযম, নীরবতা, ধর্মগ্রন্থ পাঠ, চাল-কলা প্রসাদ ও আগমনের সময়: আজকের পত্রিকা (২০২৫)।
- সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে উপবাস ভাঙা: বিডিনিউজ২৪ (২০২০)।
- প্রিয়জনপ্রতি একটি প্রদীপ, কাটা ফলে সাজানো, সূর্যাস্তে ঘণ্টা ও উলুধ্বনি, প্রচলিত কাহিনি, লোকনাথ মন্দিরগুলোতে আয়োজন: প্রেস নারায়ণগঞ্জ (২০২০)।
- প্রণাম মন্ত্র, তিনটি সূত্র মিলিয়ে: Bharat Rituals, শ্রী শিবপ্রসাদ, রত্নজ্যোতি, সনাতন ধর্মকথা।
মতামত দিন
মতামত দিতে লগইন করুন।
0 টি মতামত
কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!