রাখের উপবাস বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ভক্তদের একটি ব্রত: কার্তিক মাসের শেষ পনেরো দিনের প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার সারা দিন উপবাস রেখে সূর্যাস্তে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রিয়জনের মঙ্গল প্রার্থনা করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, কলেরা ও বসন্তের মতো রোগ থেকে রক্ষা পেতে বাবা লোকনাথ নিজেই কার্তিকে এই উপবাস আর প্রদীপ জ্বালানোর কথা বলেছিলেন।
এই লেখায় আছে ব্রতটির পরিচয়, বাবা লোকনাথের সঙ্গে এর সম্পর্ক, কেন করা হয় তা নিয়ে প্রচলিত লোককথা, আর কোন প্রশ্নের লিখিত উত্তর এখনও পাওয়া যায় না।
রাখের উপবাস কি
রাখের উপবাস একসঙ্গে তিনটি আচার: উপবাস, প্রদীপ প্রজ্বালন আর সমবেত প্রার্থনা। ভক্তরা দিনভর না খেয়ে থাকেন, বিকেলে লোকনাথ আশ্রম বা মন্দিরে গিয়ে কলাপাতায় প্রদীপ সাজিয়ে সারি বেঁধে বসেন, আর সূর্যাস্তে ঘণ্টা ও উলুধ্বনির মধ্যে সবাই একসঙ্গে প্রদীপ জ্বালান। প্রদীপ জ্বলা শেষ হলে প্রসাদ নিয়ে উপবাস ভাঙা হয়।
একই আচারকে কেউ বলেন কার্তিক ব্রত, কেউ গোঁসাইর উপবাস, কেউ ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন; নারায়ণগঞ্জে কার্তিক যজ্ঞ নামও শোনা যায়। সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদীতে, যেখানে বাবা লোকনাথ জীবনের শেষ পর্ব কাটিয়েছেন।
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী কে
ভক্তদের প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী, শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্ম ১১৩৭ বঙ্গাব্দে (১৭৩০ খ্রিস্টাব্দ), জন্মাষ্টমী তিথিতে, অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগনার বারাসাত অঞ্চলের চৌরাশী চাকলায়। এগারো বছর বয়সে উপনয়নের পর তাঁকে সন্ন্যাসের জন্য ভগবান গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। জীবনীগুলো বলে, এরপর দীর্ঘকাল তিনি যোগসাধনায় হিমালয়সহ বহু দূর দেশ ঘুরেছেন।
শেষ জীবনে তিনি বারদীতে থিতু হন। ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৭ বঙ্গাব্দে (১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ) বারদীতেই তাঁর তিরোধান হয়, আর প্রতি বছর এই দিনে সেখানে তিরোধান উৎসব হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, তিনি প্রায় ১৬০ বছর বেঁচে ছিলেন; জন্মতারিখ ও বয়স নিয়ে জীবনীগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে। তাঁর কথা আরও আছে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর পাতায়।
“রণে বনে জলে জঙ্গলে”
লোকনাথভক্তদের মুখে মুখে ফেরে তাঁর একটি আশ্বাস:
“রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।”
রাখের উপবাসের মূল ভাবও এই: বিপদ, রোগ আর দুর্ভোগ থেকে আপনজনকে রক্ষার জন্য বাবা লোকনাথকে স্মরণ। এই ব্রতে ভক্ত নিজের জন্য যতটা চান, তার চেয়ে বেশি চান পরিবারের জন্য। তাই যত জন প্রিয়জনের মঙ্গল চাওয়া হয়, তত প্রদীপ জ্বালানোর রীতি; অনেকে প্রত্যেকের নামে আলাদা প্রদীপ দেন।
রাখের উপবাস কেন করা হয়
ভক্তরা এই উপবাসে যা চান, তা মোটামুটি এক: পরিবার ও প্রিয়জনের মঙ্গল, অসুখ থেকে সেরে ওঠা, আর বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা। ব্রতের শুরু নিয়ে দুটি লোককথা প্রচলিত।
লোককথা ১: মহামারি থেকে রক্ষা
প্রচলিত বিশ্বাস, একসময় কলেরা আর বসন্তের মতো রোগে বহু মানুষ মারা যেত। সেই রোগ ঠেকাতে বাবা লোকনাথ ভক্তদের কার্তিক মাসে উপবাস রাখতে আর আশ্রমের আঙিনায় ঘিয়ের প্রদীপ ও ধূপধুনো জ্বালাতে বলেছিলেন। ভক্তরা বলেন, সেই থেকে এই ব্রতের শুরু।
লোককথা ২: শীতলা দেবী ও বারদীর পথ
নারায়ণগঞ্জে আরেকটি কাহিনি শোনা যায়। বাংলায় শীতলা দেবীকে বসন্ত রোগের দেবী বলে মানা হয়। কাহিনি অনুযায়ী, দেবী একবার বারদীর ওপর দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন; সেই পথে গেলে এলাকায় বসন্ত ছড়িয়ে পড়ত। বাবা লোকনাথ তা জানতে পেরে দেবীকে অন্য পথে যেতে অনুরোধ করেন, আর কিছু কথাবার্তার পর দেবী বারদীর পথ ছেড়ে দেন। এরপরই তিনি কার্তিকে উপবাস আর প্রদীপ জ্বালানোর নির্দেশ দেন, এমনটাই কাহিনির শেষ।
দুটিই লোকবিশ্বাস, ভক্তদের মুখে মুখে চলে আসছে; প্রমাণিত ইতিহাস নয়। ব্রতটি ঠিক কোন বছরে শুরু হয়েছিল, তার লিখিত প্রমাণ বা নির্দিষ্ট সাল পাওয়া যায় না।
কেন কার্তিক মাসে
বাংলায় কার্তিক প্রদীপের মাস। সারা মাস সন্ধ্যায় আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর রীতি আছে, কার্তিকী অমাবস্যায় দীপাবলি ও কালীপূজা। রাখের উপবাসের প্রদীপও এই মাসেই জ্বলে। তবে ব্রতটি সেসব রীতি থেকে এসেছে, এমন কোনো লিখিত সূত্র আমরা পাইনি; ভক্তদের কাছে কার্তিকে উপবাসের কারণ বাবা লোকনাথের নির্দেশ।
কেন মঙ্গলবার আর শনিবার
উপবাস হয় কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের প্রতিটি মঙ্গলবার ও শনিবার। এই দুই বারই কেন, তার কোনো লিখিত ব্যাখ্যা আমরা পাইনি; যে প্রতিবেদনগুলো দেখেছি, তার কোথাও কারণ বলা নেই। তাই এখানে কোনো অনুমান লেখা হলো না।
“রাখ” শব্দের মানে কী
“রাখ” শব্দের অর্থ রক্ষা বা সুরক্ষা। শব্দটি সংস্কৃত “রক্ষা” থেকে আগত: রক্ষ্ ধাতু (রক্ষা করা) প্রাকৃতে হয়েছে রক্খ, আর তা থেকে বাংলায় রাখ। “রাখা” ক্রিয়ায় আগলে রাখার সেই পুরোনো অর্থ আজও আছে; রাখীবন্ধনের রাখীও একই শব্দ, যার আরেক নাম রক্ষাবন্ধন।
নামেই তাই ব্রতের ভাব: রাখের উপবাস রক্ষার উপবাস, রোগ আর বিপদ থেকে প্রিয়জনকে রক্ষার প্রার্থনায় যে উপবাস রাখা হয়।
রাখের উপবাস কীভাবে পালন করা হয়
ব্রতের আগের দিন সংযম, ব্রতের দিন সারা দিন উপবাস। বিকেলে কলাপাতা বা কলাগাছের খোলে মাটির প্রদীপ, ঘি, সলতে, ধূপ, ফুল, ধান-দূর্বা নিয়ে আশ্রমে বা মন্দিরে সারি বেঁধে বসা হয়। সূর্যাস্তে সবাই একসঙ্গে প্রদীপ জ্বালান; প্রদীপ জ্বলার সময় কথা না বলে একমনে বাবা লোকনাথকে ডাকা হয়। প্রদীপ নিভে এলে চাল-কলা প্রসাদ নিয়ে উপবাস ভাঙা হয়। ধাপে ধাপে পুরো নিয়ম, উপকরণের তালিকা আর প্রণাম মন্ত্র আছে রাখের উপবাস পালনের নিয়ম লেখায়।
কোথায় পালিত হয়
সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় বারদীর শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে, যেখানে দেশের নানা জায়গা থেকে ভক্তরা আসেন। ঢাকায় বড় আয়োজন হয় স্বামীবাগের লোকনাথ আশ্রমে। নারায়ণগঞ্জ শহরসহ দেশের নানা লোকনাথ মন্দিরেও এখন এই ব্রত পালিত হয়। বারদীতে যাওয়ার পথ আর সেখানে গিয়ে কী দেখবেন, আছে বারদী লোকনাথ আশ্রমে রাখের উপবাস লেখায়। কোন মন্দিরে আয়োজন হয়, দেখুন রাখের উপবাসের উৎসব পাতায়।
প্রশ্নোত্তর
রাখের উপবাস কার উদ্দেশ্যে করা হয়?
শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আরাধনায়, পরিবার ও প্রিয়জনের মঙ্গল কামনায়। ভক্তরা রোগমুক্তি আর বিপদ থেকে রক্ষার জন্য বাবা লোকনাথের আশীর্বাদ চান।
রাখের উপবাস কোন মাসে হয়?
কার্তিক মাসের শেষ পনেরো দিনে, প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার। দিন গোনা হয় পঞ্জিকার কার্তিক ধরে; বাংলাদেশের সরকারি বাংলা ক্যালেন্ডারে কার্তিক শুরু হয় এক-দুই দিন আগে, তাই সেটা ধরে গুনলে দিন ভুল হতে পারে। এ বছর উপবাস পাঁচ দিন: ১৬, ২০, ২৩, ২৭ ও ৩০ কার্তিক ১৪৩৩ (৩, ৭, ১০, ১৪ ও ১৭ নভেম্বর ২০২৬)। বার ও সময়সহ আছে রাখের উপবাস ২০২৬: তারিখ ও সময় লেখায়।
শাস্ত্রে কি রাখের উপবাসের বিধান আছে?
কোনো পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র বা পঞ্জিকায় এই ব্রতের বিধান আমরা পাইনি। এটি বাবা লোকনাথের ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত লোকাচার; ভক্তদের বিশ্বাসে এর উৎস লোকনাথের নিজের নির্দেশ।
“রাখের উপবাস” নামের অর্থ কী?
“রাখ” মানে রক্ষা বা সুরক্ষা; শব্দটি সংস্কৃত “রক্ষা” থেকে আগত। প্রিয়জনকে রোগ ও বিপদ থেকে রক্ষার প্রার্থনায় এই উপবাস, তাই এই নাম। একই ব্রত কার্তিক ব্রত, গোঁসাইর উপবাস ও ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন নামেও পরিচিত।
কারা রাখের উপবাস পালন করেন?
লোকনাথভক্ত নারী ও পুরুষ, আর তাঁদের সঙ্গে শিশুরাও আশ্রমে আসে। উপবাস সবার জন্য একই রকম বাধ্যতামূলক, এমন অভিন্ন নিয়ম পাওয়া যায় না। অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বা বা বয়স্ক কেউ উপবাস রাখতে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, আর আচারের প্রশ্নে নিজের আশ্রম বা পুরোহিতের কাছে জেনে নিন।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
- রাখের উপবাস: মন্দিরবিডির উৎসবের পাতা
- রাখের উপবাস ২০২৬: তারিখ ও সময়
- রাখের উপবাস পালনের নিয়ম ও কিভাবে করতে হয়
- বারদী লোকনাথ আশ্রমে রাখের উপবাস
- বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী: মন্দিরবিডির মহাপুরুষের পাতা
সূত্র
- বারদী শ্রীশ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমের ফেসবুক পাতা, “১৪৩৩ বাংলা কার্তিক মাসের রাখের উপবাসের তালিকা”, ২৪ অক্টোবর ২০২৬।
- “রাখ” শব্দের উৎস: উইকশনারি (সংস্কৃত রক্ষতি, প্রাকৃত রক্খই; মধ্য বাংলা “রাখ” একই উৎসের)।
- রাখের উপবাসে ভক্তরা: প্রথম আলো, ২০২২ (উৎসবের অন্য নাম, প্রচলিত বিশ্বাস, বারদী ও স্বামীবাগ)।
- রাখের উপবাস, ছবি-প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা, ২০২৫ (আগের দিনের সংযম, প্রদীপ জ্বলার সময় নীরবতা, চাল-কলা প্রসাদ)।
- ‘রাখের উপবাস’: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০ (কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের মঙ্গল ও শনিবার, সন্ধ্যায় উপবাস ভঙ্গ)।
- যেভাবে এলো ‘রাখের উপবাস’: প্রেস নারায়ণগঞ্জ, ২০২০ (শীতলা দেবীর লোককথা, প্রিয়জনের সংখ্যায় প্রদীপ, সূর্যাস্তে প্রদীপ প্রজ্বালন)।
- নারায়ণগঞ্জের লোকনাথ মন্দিরে রাখের উপবাস: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট।
- বাবা লোকনাথের জীবন ও “রণে বনে জলে জঙ্গলে” উক্তি: খবর অনলাইন, ২০২৩; বাংলা পঞ্জিকা।
- বারদীতে ১৯ জ্যৈষ্ঠ তিরোধান উৎসব: ভ্রমণ গাইড; ১৩৬তম তিরোধান দিবস: যুগান্তর, জুন ২০২৬।
উৎপত্তির কাহিনিগুলো লোকবিশ্বাস, ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করা নয়। আয়োজন ও নিয়মের খুঁটিনাটি আশ্রমভেদে আলাদা হতে পারে; যাওয়ার আগে নিজের আশ্রম বা মন্দিরে জেনে নিন।
মতামত দিন
মতামত দিতে লগইন করুন।
0 টি মতামত
কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!