চন্দ্রনাথ মন্দিরের পবিত্রতার শেকড় প্রোথিত রয়েছে হিন্দু পুরাণের এক সুগভীর ও বেদনাবিধুর আখ্যানে। পুরাণ মতে, সত্যযুগে প্রজাপতি দক্ষের মহাযজ্ঞে দেবাদিদেব মহাদেবকে অপমান করা হলে, দেবী সতী সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুণ্ডে আত্মাহুতি দেন। প্রাণহীনা স্ত্রীর শোকে উন্মত্ত মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। সৃষ্টির ধ্বংস রোধ করতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করেন। এই খণ্ডগুলো ভারত উপমহাদেশের যে যে স্থানে পতিত হয়েছিল, সেগুলোই আজ 'শক্তিপীঠ' বা 'সতীপীঠ' নামে পরিচিত।
বিশ্বাস করা হয়, সীতাকুণ্ডের এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ে দেবী সতীর ডান হাত (দক্ষিণ হস্ত) পতিত হয়েছিল। সেই হিসেবে চন্দ্রনাথ ধাম সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি সতীপীঠ। পাহাড়ের পাদদেশে দেবী ভবানী এবং চূড়ায় শিব বা চন্দ্রনাথ—এই দুইয়ের উপস্থিতির কারণে স্থানটি শাক্ত এবং শৈব—উভয় সম্প্রদায়ের সাধকদের কাছেই সমানভাবে পূজনীয়। এখানে এলে শিব ও শক্তির এক পরম ঐশ্বরিক যুগলবন্দি অনুভব করা যায়। একদিকে শক্তিরূপিণী মায়ের মাতৃসুলভ আশ্রয়, অন্যদিকে দেবাদিদেবের বৈরাগ্য ও প্রশান্তি—এই দুই ধারার এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটেছে চন্দ্রনাথ ধামে।
পুণ্যতীর্থের প্রবেশদ্বার: ব্যাসকুণ্ড থেকে শুরু হওয়া এক আধ্যাত্মিক যাত্রা
চন্দ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছানোর যাত্রাটি কেবল একটি শারীরিক আরোহণ নয়, এটি মূলত আত্মশুদ্ধির এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মূল মন্দিরে যাওয়ার আগে পাহাড়ের পাদদেশে বেশ কয়েকটি পবিত্র স্থান অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো 'ব্যাসকুণ্ড'। পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুযায়ী, মহামুনি ব্যাসদেব এই পবিত্র কুণ্ডের তীরে বসে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন এবং দীর্ঘকাল এখানে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। চন্দ্রনাথ দর্শনে যাওয়ার আগে ভক্তরা এই ব্যাসকুণ্ডের পবিত্র জলে স্নান করে নিজেদের দেহ ও মনকে শুদ্ধ করে নেন। বিশ্বাস করা হয়, এই কুণ্ডের জলে স্নান করলে জন্ম-জন্মান্তরের পাপ মোচন হয়।
ব্যাসকুণ্ডের পাশেই রয়েছে শতবর্ষী এক প্রাচীন বটবৃক্ষ, যাকে 'অক্ষয় বট' বলা হয়। মুনি-ঋষিদের ধ্যানের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল বৃক্ষটি। এখানে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলে আজও যেন প্রাচীন ঋষিদের বেদমন্ত্র উচ্চারণের ধ্বনি কানে ভেসে আসে। এখান থেকেই শুরু হয় পাহাড়ের চূড়ার দিকে ওঠার দুর্গম পথ।






