মূল বিষয়বস্তুতে যান
তথ্য উপাত্ত

কালীপূজার মন্ত্র অর্থসহ: পুষ্পাঞ্জলি, প্রণাম ও ধ্যান

ববাংলাদেশের মন্দির এডমিন
২৭ অক্টোবর ২০২৬
৬ মিনিট পড়া
০

কালীপূজার পুষ্পাঞ্জলিতে সবচেয়ে প্রচলিত শ্লোকটি হলো "কালি কালি মহাকালি কালিকে পাপহারিণি"; প্রণামে বলা হয় চণ্ডীর "সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে", আর দক্ষিণাকালীর ধ্যান শুরু হয় "করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাম্" দিয়ে। নিচে প্রতিটি শ্লোক পুরো দেওয়া আছে, সঙ্গে সহজ বাংলায় অর্থ।

শ্যামাপূজা ২০২৬ পঞ্জিকা মতে ২১ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার (৮ নভেম্বর)। ঢাকায় নিশীথকাল রাত ১১টা ১৬ মিনিট থেকে রাত ১২টা ৮ মিনিট (দৃক্‌ পঞ্চাঙ্গ)। পূজার সময় ও নিয়ম আছে মন্দিরবিডির কালীপূজার পাতায়।

এই লেখার মন্ত্র কীভাবে বাছা হয়েছে

কালীপূজার মন্ত্র অনলাইনে নানা রূপে ছড়ানো: একই শ্লোকের শব্দ, বানান, এমনকি অর্থ পর্যন্ত এক সূত্র থেকে আরেক সূত্রে বদলে যায়। তাই এখানে কেবল সেই শ্লোকগুলোই দেওয়া হলো, যেগুলো অন্তত দুটি আলাদা সূত্রে অক্ষরে অক্ষরে এক। কোন মন্ত্র কোথা থেকে নেওয়া, তা লেখার শেষে সূত্র অংশে আছে।

যা এই পরীক্ষায় টেকেনি, তা ইচ্ছা করেই বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন প্রণাম হিসেবে প্রচলিত "কালি কালি মহাকালি…"-এর যে দ্বিতীয় চরণ "ধর্মার্থমোক্ষদে" দিয়ে শুরু হয়, তার একাধিক পাঠ পাওয়া যায়, কিন্তু দুটি স্বাধীন সূত্রে হুবহু এক পাঠ পাওয়া যায়নি। দক্ষিণাকালীর পুরো ধ্যানমন্ত্রও (এগারোটি শ্লোক) সূত্রভেদে আলাদা; এক জায়গায় তো দেবীর ডান হাতের বরাভয়ের ক্রমই উল্টো। পুরো পূজাবিধির জন্য পরিবারের পুরোহিত দর্পণ বা কুলপুরোহিতের পাঠই মানুন।

কালীপূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র

দক্ষিণাকালীর পুষ্পাঞ্জলিতে এই শ্লোকটি দুটি আলাদা সূত্রে অক্ষরে অক্ষরে এক। কেউ কেউ শুরুতে "ওঁ" যোগ করে বলেন।

কালি কালি মহাকালি কালিকে পাপহারিণি।

ধর্ম্মকামপ্রদে দেবি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥

অর্থ: হে কালী, হে মহাকালী, হে কালিকা, তুমি পাপ হরণ করো। তুমি ধর্ম আর মনের সৎ কামনা পূর্ণ করো; হে দেবী নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম।

"কালি", "মহাকালি", "কালিকে" একই দেবীকে বারবার ডাকা, যেমন মা-কে কেউ বারবার নাম ধরে ডাকে। "নারায়ণী" চণ্ডীতে দেবীর প্রচলিত সম্বোধন; যিনি সবার আশ্রয়, এখানে সেই অর্থে।

অঞ্জলির পূর্ণ বাক্যে শেষে দেবীর নাম নিয়ে "দক্ষিণাকালিকায়ৈ নমঃ" বলা হয়, অর্থাৎ দক্ষিণাকালীকে নমস্কার। এই অংশটি কয়েকটি সূত্রেই আছে, কিন্তু তার আগের "এষ … পুষ্পাঞ্জলিঃ" অংশের পাঠ সূত্রভেদে আলাদা, তাই সেটি এখানে দেওয়া হলো না; মন্দিরে পুরোহিত যেভাবে বলান, সেভাবে বলুন।

কালীর প্রণাম মন্ত্র

দক্ষিণাকালীর প্রণাম হিসেবে অনেক সূত্রে চণ্ডীর এই শ্লোকটি দেওয়া হয়। দুর্গা, কালী, সব দেবীর প্রণামেই শ্লোকটি বহুল প্রচলিত।

ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥

অর্থ: তুমি সব মঙ্গলের মঙ্গল, কল্যাণময়ী, সব উদ্দেশ্য সফল করো। তুমি সবার আশ্রয়, তিন নয়ন তোমার, তুমি গৌরী; হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম।

পুরোনো বইয়ে "সর্ব্ব", "সর্ব্বার্থ" এভাবে দুই ব-ফলায় লেখা পাবেন; উচ্চারণ ও অর্থ একই।

কালীর ধ্যান মন্ত্র

পূজার আগে দেবীর রূপ মনে আনার জন্য ধ্যান। দক্ষিণাকালীর ধ্যানের প্রথম শ্লোকটি দুটি আলাদা সূত্রে অক্ষরে অক্ষরে এক:

করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাম্।

কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাম্॥

অর্থ: যাঁর মুখ ভয়ংকর, রূপ ঘোর, চুল খোলা, যাঁর চার হাত; সেই দিব্য দক্ষিণাকালিকাকে, যিনি মুণ্ডমালায় সাজানো, তাঁকে ধ্যান করি।

এই ধ্যানেরই আরেকটি চরণে দেবীর গায়ের রঙের কথা আছে, আর সেটিও একাধিক সূত্রে এক:

মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং তথা চৈব দিগম্বরীম্।

অর্থ: যাঁর আভা ঘন মেঘের মতো, যিনি শ্যামবর্ণা, দিকই যাঁর বসন।

এই চরণেই "শ্যামা" নামের উৎস। দেবীর রং ঘন বর্ষার মেঘের মতো কালো-নীল, তাই তিনি শ্যামা, আর তাঁর পূজা শ্যামাপূজা। শশিভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর শাক্ত সাধনা বিষয়ক বইয়ে এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।

ধ্যানের বাকি শ্লোকগুলোয় দেবীর হাতের অস্ত্র, বরাভয়, শিবের ওপর দাঁড়ানো রূপ আর শ্মশানবাসের বর্ণনা আছে। কিন্তু সেগুলোর পাঠ সূত্রভেদে আলাদা, তাই পুরো ধ্যান পড়তে হলে ছাপা পুরোহিত দর্পণ বা তন্ত্রসার দেখে নিন।

অঞ্জলি কখন, কীভাবে দেওয়া হয়

কালীপূজা রাতের পূজা। যে রাতে মাঝরাতে অমাবস্যা থাকে, সেই রাতে নিশীথকালে পূজা হয়, তাই অঞ্জলিও সাধারণত গভীর রাতে, পূজা শেষ হলে। আগের বছরগুলোতে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে রাত সাড়ে ৯টা থেকে পূজা শুরু হয়ে অঞ্জলি হয়েছে রাত ৩টার দিকে; ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে রাত ১০টা থেকে পূজার পর অঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। এ বছরের সময় প্রতিটি মন্দির নিজে জানাবে, তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নিয়ে যান।

অঞ্জলিতে হাতে ফুল, বেলপাতা আর চন্দন নিয়ে পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্র বলে দেবীর পায়ে দেওয়া হয়। কতবার অঞ্জলি, কোন শ্লোকের পর কোনটি, তা মন্দির ও পুরোহিতের রীতি অনুযায়ী। অনেকে অঞ্জলি দেওয়া পর্যন্ত উপবাস রাখেন; এটি প্রচলিত রীতি, বাধ্যতামূলক নয়। শরীর সায় না দিলে জল ও ফল খেয়ে নিন।

মন্ত্র না জানলে

সংস্কৃত শ্লোক মুখস্থ না থাকলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মন্দিরে পুরোহিত মন্ত্র বলেন, ভক্তরা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বলেন। বাড়িতে বা একা প্রণাম করলে বাংলায় মন দিয়ে "মা কালী, তোমাকে প্রণাম, সবাইকে ভালো রেখো" বললেও প্রণামের ভাব পূর্ণ হয়। শ্লোক উচ্চারণ ভুল হওয়ার ভয়ে ভক্তি থেমে থাকার কথা নয়।

"যা দেবী সর্বভূতেষু" নিয়ে একটি কথা

সামাজিক মাধ্যমে "যা দেবী সর্বভূতেষু" স্তবে কালীর নামে একটি চরণ জুড়ে সেটিকে কালীপূজার মন্ত্র বলে ছড়ানো হয়। চণ্ডীর পঞ্চম অধ্যায়ের ওই স্তবে দেবীর বুদ্ধি, শক্তি, শান্তি, শ্রদ্ধা, লক্ষ্মী, মাতৃ প্রভৃতি রূপের কথা আছে, কিন্তু কালীর নামে কোনো চরণ নেই। তাই সেটি এখানে দেওয়া হলো না।

প্রশ্নোত্তর

কালীপূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র কী?

সবচেয়ে প্রচলিত শ্লোক: "কালি কালি মহাকালি কালিকে পাপহারিণি। ধর্ম্মকামপ্রদে দেবি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥" অর্থ, হে কালী, পাপহারিণী, ধর্ম ও সৎ কামনা যিনি পূর্ণ করেন, হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম। অঞ্জলি শেষ হয় "দক্ষিণাকালিকায়ৈ নমঃ" বলে।

কালীর প্রণাম মন্ত্র কী?

প্রণামে চণ্ডীর শ্লোকটি বহুল প্রচলিত: "ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥" "কালি কালি মহাকালি…" দিয়ে শুরু যে প্রণাম মন্ত্র প্রচলিত, তার দ্বিতীয় চরণের পাঠ সূত্রভেদে আলাদা।

কালীপূজায় অঞ্জলি কখন দেওয়া হয়?

রাতে, নিশীথকালের পূজার পর। ২০২৬ সালে ঢাকায় নিশীথকাল ২১ কার্তিক (৮ নভেম্বর) রাত ১১টা ১৬ মিনিট থেকে রাত ১২টা ৮ মিনিট। মন্দিরভেদে অঞ্জলি অনেক রাতে হয়; আগের বছরগুলোতে কোথাও রাত ৩টার দিকেও হয়েছে।

মন্ত্র না জানলে কী করব?

মন্দিরে পুরোহিতের সঙ্গে সঙ্গে বলুন। একা প্রণাম করলে বাংলায় মন দিয়ে মা কালীকে ডাকলেই চলে।

কালীকে শ্যামা বলা হয় কেন?

ধ্যানমন্ত্রে দেবীকে বলা হয়েছে "মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং", অর্থাৎ ঘন মেঘের মতো আভা, শ্যামবর্ণা। এই রঙের জন্যই তিনি শ্যামা, আর কালীপূজাকে বলা হয় শ্যামাপূজা।

এই বিষয়ে আরও পড়ুন

সূত্র

মতামত দিন

মতামত দিতে লগইন করুন।

0 টি মতামত

কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!