দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাস ঘাঁটলে মনে হতো, সার্জারি বা শল্যচিকিৎসার শুরুটা বুঝি গ্রিস বা রোম থেকেই হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের সত্য কখনো চাপা থাকে না। সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং সম্মানজনক সার্জিক্যাল প্রতিষ্ঠান 'রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস' (RCSEd)-এ স্থাপন করা হলো প্রাচীন ভারতের কিংবদন্তি চিকিৎসক মহর্ষি সুশ্রুতের মূর্তি। এর মাধ্যমে পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিল যে, মহর্ষি সুশ্রুতই হলেন প্রকৃত অর্থে 'সার্জারির জনক' (Father of Surgery)।

একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
১৫১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত 'রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস অফ এডিনবার্গ'-এর মর্যাদাপূর্ণ প্লেফেয়ার অডিটোরিয়ামে গত ১৯ জুন একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে ভারতের কনসাল জেনারেল শ্রী সিদ্ধার্থ মালিক এবং রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ক্লেয়ার ম্যাকনট আনুষ্ঠানিকভাবে মূর্তিটি উন্মোচন করেন। এই অসাধারণ উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়েছে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিখ্যাত সার্জন প্রফেসর চন্দ্র চেরুভু এবং তাঁর 'চেরুভু ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন'-এর একান্ত প্রচেষ্টায়।
মূর্তির নেপথ্যে: স্বামীমালাইয়ের নিখুঁত কারিগরি
এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, এটি ভারতের প্রাচীন ভাস্কর্য শিল্পেরও এক অনন্য নিদর্শন।
নির্মাণস্থল ও কারিগর: মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছে তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলার বিখ্যাত স্বামীমালাইতে। প্রখ্যাত ভাস্কর শ্রী রাঘবানন্দম স্থপতি এবং তাঁর পাঁচজন সহকারী এই চমৎকার শিল্পকর্মটি তৈরি করেছেন।
নির্মাণ কৌশল: প্রাচীন 'লস্ট-ওয়াক্স' (lost-wax) এবং সিঙ্গল ব্রোঞ্জ কাস্টিং পদ্ধতি ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে।
পরিশ্রম ও সময়: প্রায় ৯০ কেজি ওজনের এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে কারিগরদের দুই মাসেরও বেশি সময় লেগেছে।
ভ্রান্তি নিরসন: প্রকাশিত হলো নতুন গবেষণামূলক বই
মূর্তি উন্মোচনের পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানে "Maharishi Sushruta: A Compendium – Father of Surgery" নামে একটি গবেষণামূলক বইও প্রকাশ করা হয়। বইটিতে সারা বিশ্বের ৪০ জন বিশেষজ্ঞ লেখকের ৩৬টি অধ্যায় স্থান পেয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বে এতদিন মনে করা হতো, চিকিৎসাশাস্ত্রের এথিক্স বা নিয়মকানুন হিপোক্রেটিসের হাত ধরে এসেছে। কিন্তু এই বইটিতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে যে, হিপোক্রেটিসের বহু আগে মহর্ষি সুশ্রুত চিকিৎসার নীতি ও এথিক্স তৈরি করে গিয়েছিলেন।
মহর্ষি সুশ্রুত: কেন তিনি 'ফাদার অফ সার্জারি'?
সুশ্রুত শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের একজন মাস্টার আর্কিটেক্ট।
সুশ্রুত সংহিতা: আজ থেকে প্রায় ২৬০০ বছর আগে তিনি 'সুশ্রুত সংহিতা' রচনা করেন, যা আজও শল্যচিকিৎসার প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
সার্জারি ও যন্ত্রপাতি: সেই প্রাচীন যুগে তিনি ৩০০-র বেশি ধরনের জটিল সার্জারি সম্পন্ন করেছিলেন এবং ১২৪ রকমের সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন করেছিলেন, যার অনেকগুলোর মূল ডিজাইন আধুনিক আমলেও ব্যবহৃত হয়।
প্লাস্টিক সার্জারি: তিনি ছিলেন প্লাস্টিক সার্জারির পথিকৃৎ। কপাল থেকে চামড়া নিয়ে সফলভাবে নাকের পুনর্গঠন বা রাইনোপ্লাস্টি (Rhinoplasty) করার পদ্ধতি তিনিই বিশ্বকে শিখিয়েছিলেন।
পশ্চিমা বিশ্বের এই স্বীকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রাচীন ভারতের মুনি-ঋষিরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে কতটা অগ্রসর ছিলেন। এডিনবার্গের এই মূর্তিটি শুধু অতীতের গৌরব নয়, বরং আগামী প্রজন্মের চিকিৎসক এবং গবেষকদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
