অন্নকূট উৎসব ও গোবর্ধন পূজা ২০২৬ পঞ্জিকা মতে ২৩ কার্তিক ১৪৩৩, মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর)। দিনটি কালী পূজার দুদিন পরে, কার্তিকের শুক্ল প্রতিপদে। এদিন শ্রীকৃষ্ণকে নানা রকম রান্না করা খাবার পাহাড়ের মতো সাজিয়ে নিবেদন করা হয়। তারপর সেই ভোগ প্রসাদ হিসেবে সবার মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এই লেখায় আছে এ বছর দিনটি কবে আর কেন কোথাও ৯ নভেম্বর লেখা দেখবেন। সঙ্গে গোবর্ধন পাহাড় তোলার কাহিনি, অন্নকূট আর ছাপ্পান্ন ভোগের মানে, আর বাংলাদেশের কোন মন্দিরে অন্নকূট হয়।
এক নজরে অন্নকূট ২০২৬
অন্নকূট ও গোবর্ধন পূজা: ২৩ কার্তিক, মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর)
প্রতিপদ তিথি: ৯ নভেম্বর দুপুর ১টা ২ মিনিট থেকে ১০ নভেম্বর দুপুর ২টা ৩০ মিনিট (মন্দিরবিডি পঞ্জিকা)
প্রাতঃকালের মুহূর্ত, ঢাকা: সকাল ৬টা ৯ মিনিট থেকে ৮টা ২২ মিনিট (দৃক্ পঞ্চাঙ্গ)
ইসকনের বৈষ্ণব ক্যালেন্ডার, ঢাকা: ১০ নভেম্বর মঙ্গলবার গোবর্ধন পূজা ও গো পূজা
আগে ও পরে: দীপাবলি ও শ্যামা পূজা ২১ কার্তিক (৮ নভেম্বর), ভাইফোঁটা ২৪ কার্তিক (১১ নভেম্বর)
অন্নকূট ২০২৬ কবে: ৯ না ১০ নভেম্বর
গোবর্ধন পূজা হয় কার্তিকের শুক্ল প্রতিপদে, যেদিন সকালে প্রতিপদ তিথি থাকে। এ বছর প্রতিপদ শুরু হচ্ছে ৯ নভেম্বর দুপুরে, তাই ৯ নভেম্বর সকালে তখনো অমাবস্যা। ১০ নভেম্বর সকালে প্রতিপদ থাকে, তাই বাংলাদেশে দিনটি ১০ নভেম্বর। দৃক্ পঞ্চাঙ্গ ঢাকার জন্য, আর ইসকনের বৈষ্ণব ক্যালেন্ডার ঢাকা, কলকাতা ও মায়াপুরের জন্য একই দিন দেয়।
কিছু ওয়েবসাইটে ৯ নভেম্বর লেখা থাকে। এর বড় কারণ আমেরিকার সময়: সেখানে প্রতিপদ ৯ নভেম্বর ভোরের আগেই শুরু হয়, তাই আমেরিকায় দিনটি ৯ নভেম্বর। বাংলাদেশের জন্য সেই তারিখ ঠিক নয়।
তবে সব মন্দির ঠিক প্রতিপদের দিনেই অন্নকূট করে না। চট্টগ্রামের ইসকন মন্দিরে কয়েক বছর অন্নকূট হয়েছে শ্রীল প্রভুপাদের তিরোভাব তিথির সঙ্গে একসঙ্গে। তাই যাওয়ার আগে মন্দিরের ঘোষণা দেখে নিন।
গোবর্ধন পূজার কাহিনি
ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধে কাহিনিটি আছে। ব্রজের গোপেরা প্রতি বছর বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের পূজা করতেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের বললেন, গরু আর গোবর্ধন পাহাড়ই তাঁদের জীবিকা। তাই ইন্দ্রের বদলে গরু, ব্রাহ্মণ আর গোবর্ধন পাহাড়ের পূজা করা হোক।
ব্রজবাসীরা তা-ই করলেন। ক্ষুব্ধ ইন্দ্র প্রবল ঝড়বৃষ্টি পাঠালেন। শ্রীকৃষ্ণ কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে ধরলেন, আর তার নিচে আশ্রয় নিল সব ব্রজবাসী আর তাঁদের গরু। সাত দিন তিনি পাহাড় ধরে রাখলেন। শেষে ইন্দ্রের অহংকার ভাঙল, তিনি মেঘ সরিয়ে নিলেন।
এই কাহিনির স্মরণেই গোবর্ধন পূজা। ব্রজে গোবর দিয়ে গোবর্ধন পাহাড়ের প্রতিরূপ বানিয়ে পূজার রীতি আছে। একই দিনে গো-পূজাও হয়।
অন্নকূট মানে কী
অন্ন মানে ভাত বা খাদ্য, কূট মানে পর্বত বা চূড়া। অন্নকূট মানে খাবারের পাহাড়। এদিন নানা রকম রান্না করা পদ আর মিষ্টি থরে থরে পাহাড়ের মতো সাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করা হয়। পরে সেই ভোগ প্রসাদ হিসেবে ভক্ত আর অতিথিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
ছাপ্পান্ন ভোগ কেন
অন্নকূটে ছাপ্পান্ন ভোগের কথা প্রায়ই শোনা যায়। এর একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা আছে। শ্রীকৃষ্ণ দিনে আটবার খেতেন, আর পাহাড় ধরে রাখার সাত দিন তিনি কিছু খাননি। তাই পরে আট গুণ সাত, ছাপ্পান্ন পদ রেঁধে তাঁকে খাওয়ানো হয়। এটি ভক্তির ঐতিহ্য, শাস্ত্রের নির্দিষ্ট বিধান নয়, আর অন্য ব্যাখ্যাও আছে। এখন অনেক মন্দিরে পদের সংখ্যা ছাপ্পান্ন ছাড়িয়ে শত বা হাজারে যায়।
কালী মন্দিরেও অন্নকূট
অন্নকূট মূলত বৈষ্ণবদের উৎসব। তবে পশ্চিমবঙ্গের কিছু কালী মন্দিরে আর শাক্ত পরিবারেও কালী পূজার পরের দিন অন্নকূটের চল আছে।
বাংলাদেশে কোথায় অন্নকূট হয়
নিচের মন্দিরগুলোতে আগের বছরগুলোতে অন্নকূট হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আছে। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো মন্দির ২০২৬ সালের সময়সূচি প্রকাশ করেনি। তাই যাওয়ার আগে মন্দিরের ঘোষণা দেখে নিন।
ইসকন স্বামীবাগ, ঢাকা: ২০১৯ সালের খবরে, শ্যামা পূজার পরে এখানে গিরি গোবর্ধন পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব হয়, আর ভোগ নিতে ভক্তদের লাইন পড়ে। মন্দিরের পাতা: স্বামীবাগ ইসকন মন্দির।
ইসকন সিলেট: ২০২২ সালে প্রায় আড়াই হাজার পদের ভোগ নিবেদন করা হয়, আর দশ হাজারের বেশি ভক্ত ও অতিথির মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার: উত্তরশূরের শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু আশ্রম ও মিশনে ২০২৫ সালে ১,০৫০ রকমের ব্যঞ্জনে অন্নকূট হয়, প্রসাদ পান প্রায় ২০ হাজার ভক্ত। শ্রীমঙ্গলের সবুজবাগ, রুপসপুর ও উত্তরশূরের ইসকন মন্দিরেও অন্নকূট হয়।
চট্টগ্রাম: ইসকনের মন্দিরে অন্নকূট মহোৎসব হয়, কয়েক বছর শ্রীল প্রভুপাদের তিরোভাব তিথির সঙ্গে একসঙ্গে।
আপনার এলাকার মন্দিরে অন্নকূট হয়?
উপরের তালিকা ছোট, কারণ সব মন্দিরের খবর সংবাদমাধ্যমে আসে না। আপনার এলাকার মন্দিরে অন্নকূট হলে মন্তব্যে মন্দিরের নাম, জেলা আর সময় লিখুন, যাতে আশপাশের ভক্তরা জানতে পারেন।
মন্দিরটি মন্দিরবিডিতে না থাকলে মন্দির যোগ করুন। আপনি মন্দির কমিটিতে থাকলে মন্দিরের দায়িত্ব নিন। তাহলে অন্নকূটের মতো অনুষ্ঠানের খবর নিজেই মন্দিরের পাতায় দিতে পারবেন।
প্রসাদ নিতে গেলে
বড় মন্দিরে হাজারো মানুষের ভিড় হয়। শিশু আর বয়স্কদের কাছে কাছে রাখুন।
লাইনে দাঁড়িয়ে প্রসাদ নিন, আর যতটুকু খাবেন ততটুকুই নিন।
প্রসাদের পাতা বা থালা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন।
প্রশ্নোত্তর
অন্নকূট উৎসব ২০২৬ কবে?
২৩ কার্তিক, মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর ২০২৬), কার্তিকের শুক্ল প্রতিপদে। কিছু মন্দিরে দিন আলাদা হতে পারে, মন্দিরের ঘোষণা দেখে নিন।
গোবর্ধন পূজা ২০২৬ কি ৯ নভেম্বর?
বাংলাদেশে নয়। এখানে ৯ নভেম্বর সকালে অমাবস্যা থাকে, প্রতিপদ পাওয়া যায় ১০ নভেম্বর সকালে। ৯ নভেম্বর তারিখটি আমেরিকার সময়ের হিসাব।
গোবর্ধন পূজা কেন করা হয়?
শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রের ঝড়বৃষ্টি থেকে ব্রজবাসীদের বাঁচাতে কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে ধরেছিলেন। সেই কাহিনির স্মরণে গোবর্ধন পূজা।
অন্নকূট মানে কী?
অন্ন মানে খাদ্য, কূট মানে পর্বত। অন্নকূট মানে খাবারের পাহাড়, অর্থাৎ পাহাড়ের মতো সাজানো ভোগ।
গোবর্ধন পূজা আর অন্নকূট কি একই?
একই দিনের দুটি দিক। গোবর্ধন পূজা হলো পূজা, আর অন্নকূট হলো সেই পূজায় পাহাড়ের মতো সাজানো ভোগ ও তার প্রসাদ বিতরণ।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
সূত্র
প্রতিপদ তিথি: মন্দিরবিডি পঞ্জিকা, ২২ কার্তিক ও ২৩ কার্তিক ১৪৩৩।
তারিখ ও প্রাতঃকাল, ঢাকা: দৃক্ পঞ্চাঙ্গ, গোবর্ধন পূজা ২০২৬, ঢাকা। ইসকনের তারিখ: বৈষ্ণব ক্যালেন্ডার (GCal) ২০২৬, ঢাকা।
আমেরিকায় ৯ নভেম্বর: হিন্দুটোন, গোবর্ধন পূজা ২০২৬ (আমেরিকা)।
গোবর্ধনের কাহিনি: ভাগবত পুরাণ, দশম স্কন্ধ, অধ্যায় ২৪ ও অধ্যায় ২৫ (সাত দিন: ১০.২৫.২৩; ইন্দ্রের অহংকার ভাঙা: ১০.২৫.২৪)।
কনিষ্ঠ আঙুল ও অন্নকূটের ভোগ বিতরণ: ইসকন বেঙ্গালুরু। গোবরের গোবর্ধন ও গো-পূজা: ইসকন ডিজায়ার ট্রি।
অন্নকূট শব্দের অর্থ: ডেইলি নিউজ রিল, ২১ অক্টোবর ২০২৫। ছাপ্পান্ন ভোগের প্রচলিত ব্যাখ্যা: বোল্ডস্কাই।
কালী মন্দির ও শাক্ত পরিবারে অন্নকূট: খবর এই সময়, ২০২১।
ইসকন স্বামীবাগ: বিডিনিউজ২৪, ২০১৯। ইসকন সিলেট: সিলেটভিউ২৪, ২০২২।
শ্রীমঙ্গল: জালালাবাদ বার্তা, ২০২৫; আজকের পত্রিকা, ২০২১।
চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ পোস্ট, ২০২২; প্রথম আলো, ১৫ নভেম্বর ২০১৫ (ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির)।
মন্দিরবিডি এখন হাতের মুঠোয়
কাছের মন্দির খুঁজুন, পঞ্জিকা পড়ুন, উৎসবের তারিখ হাতের কাছে রাখুন। অ্যান্ড্রয়েডে বিনামূল্যে।
- কাছের মন্দির, সঙ্গে প্রসাদ ও আরতির সময়
- দৈনিক পঞ্জিকা ও উৎসবের বার্তা
- বাংলা ও ইংরেজি — দুই ভাষাতেই
মতামত দিন
মতামত দিতে লগইন করুন।
0 টি মতামত
কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!



