
জগৎজ্যোতি দাস
জীবনী
শহীদ জগৎজ্যোতি দাস (বীর বিক্রম) বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য ও কিংবদন্তিতুল্য গেরিলা যোদ্ধা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভাটি বা হাওর অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তিনি এই অঞ্চলে গঠিত বিখ্যাত গেরিলা বাহিনী ‘দাস পার্টি’-র কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জগৎজ্যোতি দাস। তাঁর পিতা জীতেন্দ্র চন্দ্র দাস এবং মাতা ললিতা বালা দাস। তিনি জলসুখা কৃষ্ণ গোবিন্দ পাবলিক হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জগৎজ্যোতি দাস দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ভারতের আসামের তেজপুরের ইকো-১ ক্যাম্পে গেরিলা যুদ্ধ, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং আধুনিক অস্ত্র চালনার ওপর উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। হাওর অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি চৌকস গেরিলা দল গঠন করেন, যা তাঁর নামানুসারে ‘দাস পার্টি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। জগৎজ্যোতি দাসের নেতৃত্বে ‘দাস পার্টি’ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকারদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে। জলপথের যুদ্ধে তাঁর রণকৌশল ছিল অত্যন্ত কার্যকর। তিনি ও তাঁর দল পাকিস্তানি নৌযান, অস্ত্রবাহী কার্গো এবং লঞ্চের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে শত্রুপক্ষের সরবরাহ লাইন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেন। আজমিরীগঞ্জ, শাল্লা, দিরাই ও জামালগঞ্জ এলাকায় তাঁর পরিচালিত বেশ কয়েকটি অপারেশন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বদরপুর নামক স্থানে জগৎজ্যোতি দাসের দল পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারদের একটি বড় বাহিনীর মুখোমুখি হয়। একপর্যায়ে শত্রুপক্ষ তাঁদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের সহযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে জগৎজ্যোতি নিজে কভারিং ফায়ার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সহযোদ্ধাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি একাই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেন। যুদ্ধ চলাকালীন একপর্যায়ে শত্রুর স্নাইপারের বুলেট তাঁর মাথায় বিদ্ধ হলে তিনি বীরগতি প্রাপ্ত হন। তার শহীদ হবার পর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা তাঁর মরদেহ আজমিরীগঞ্জ বাজারে এনে অমানষিক ও অসম্মানজনকভাবে ঝুলিয়ে রাখে, যাতে সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু তাঁর এই আত্মত্যাগ স্থানীয় মানুষের মনে প্রতিরোধের আগুন আরও জ্বালিয়ে দেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য বীরত্ব, নেতৃত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
তথ্যসূত্র ও আরও জানুন
Forgotten Freedom Fighter Jagatjyoti Das | মুক্তিযুদ্ধের ৮ম বীরশ্রেষ্ঠ | Nasir Tamzid Official
কেন কেড়ে নেওয়া হলো ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ জগতজ্যোতি দাসের খেতাব? | Bangladesh liberation war | the POST
৮ম বীরশ্রেষ্ঠ ছিল, কিন্তু ইতিহাস কেন লুকাল? জগৎজ্যোতি দাস
উল্লেখযোগ্য অবদান
ডেটাবেসে কোনো সংযুক্ত অবদান পাওয়া যায়নি।





