শরৎকাল মানেই বাঙালির হৃদয়ে আনন্দময়ীর আগমনী বার্তা। ঢাকের বাদ্য, শিউলির গন্ধ আর মাতৃবন্দনায় মেতে ওঠে আপামর সনাতনী সমাজ। কিন্তু বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক ট্রেন্ডের প্রভাবে আমরা নিজেদের অজান্তেই অনেক শাস্ত্রবিরুদ্ধ শব্দের প্রয়োগ করে ফেলছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো দুর্গাপূজার প্রতিটি তিথির পূর্বে ঢালাওভাবে 'মহা' বিশেষণটি জুড়ে দেওয়া।
আজকাল হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস বা ফেসবুকে খুব সহজেই 'মহাচতুর্থী', 'মহাপঞ্চমী', 'মহাষষ্ঠী' বা 'মহাসপ্তমী' বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়। কিন্তু একজন সচেতন সনাতনী হিসেবে আমাদের জানা উচিত— এই প্রয়োগ কি আদৌ শাস্ত্রসম্মত? সনাতন ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণ কী বলছে? আসুন, আজ MandirBD-এর এই বিশেষ ব্লগে আমরা শাস্ত্রীয় প্রমাণ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
'মহা' শব্দের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
সনাতন দর্শনে 'মহা' (Maha) শব্দটি অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ। 'মহা' অর্থ হলো সর্বোচ্চ, পরম বা যা সাধারণের ঊর্ধ্বে। পূজার যে স্তরে এসে সাধারণ জাগতিক চেতনা পরম ঐশ্বরিক চেতনায় বিলীন হয়, যেখানে শক্তির পূর্ণ জাগরণ ঘটে, কেবল সেই স্তরটিকেই 'মহা' বলা যায়। দুর্গাপূজা হলো একটি পর্যায়ক্রমিক আধ্যাত্মিক যাত্রা। এর শুরু থেকেই সবকিছু 'মহা' হয়ে যায় না; বরং ধাপে ধাপে এটি তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।
তিথিগুলোর শাস্ত্রীয় কর্ম: প্রস্তুতি বনাম পূর্ণতা
দুর্গাপূজার প্রতিটি দিনের একটি নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। আমরা যদি ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত পূজার আর্কিটেকচার বা গঠনতন্ত্র লক্ষ্য করি, তবে বিষয়টি স্পষ্ট হবে:
ষষ্ঠী (বোধন ও অধিবাস): এটি হলো প্রস্তুতির দিন। বেলতলায় দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস হয়। অর্থাৎ, মহাশক্তিকে আবাহন করে জাগ্রত করা হয়। এটি পূজার সূচনা পর্ব।
সপ্তমী (প্রাণপ্রতিষ্ঠা): নবপত্রিকা স্থাপন এবং দেবীর প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মূল পূজার শুরু হয়।
অষ্টমী ও নবমী (পূর্ণতা): এই দুটি দিন হলো পূজার ক্লাইম্যাক্স বা সর্বোচ্চ শিখর। এই দুই দিনেই দেবীর পূর্ণাঙ্গ শক্তির প্রকাশ ঘটে এবং ভক্তের সাথে পরমাত্মার গভীর সংযোগ স্থাপিত হয়।
যেহেতু ষষ্ঠী ও সপ্তমী হলো প্রস্তুতির ও সূচনার পর্যায়, তাই শাস্ত্রকারগণ এই দিনগুলোতে 'মহা' বিশেষণ যুক্ত করেননি।
স্মার্ত রঘুনন্দন ও 'দুর্গোৎসবতত্ত্ব'-এর বিধান
ষোড়শ শতাব্দীর প্রখ্যাত স্মৃতিশাস্ত্রকার স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য তাঁর 'অষ্টবিংশতিতত্ত্ব'-এর অন্তর্গত 'দুর্গোৎসবতত্ত্ব'-এ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, দুর্গাপূজার সকল তিথির পূর্বে 'মহা' বিশেষণ যোগ করা বিধিসম্মত নয়। তিনি কেবল অষ্টমী ও নবমী তিথিকেই এই অভিধা দিয়েছেন:
মহাষ্টমী (মহাবিপদ থেকে উদ্ধার): শাস্ত্রে বলা হয়েছে— "মহাবিপত্তারকত্বাদ্ গীয়তেহসৌ মহাষ্টমী।" অর্থাৎ, মহাশক্তি দেবী দুর্গার এই তিথিতেই বিশেষ আবির্ভাবে ত্রিলোকের মহাবিপদ দূরীভূত বা বিনাশ হয়েছিল। যেহেতু এই তিথি জগৎকে 'মহাবিপদ' থেকে তারণ করে, তাই এর নাম 'মহাষ্টমী'।
মহানবমী (মহাসম্পদ লাভ): শাস্ত্র বলছে— "মহাসম্পাদ্দায়কত্বাৎ সা মহানবমী মতা।" অর্থাৎ, এই তিথি পূজককে বা সর্বজনকে 'মহাসম্পদ' (সমৃদ্ধি, সিদ্ধি, ভক্তি ও কল্যাণ) দান করে বলে এটি 'মহানবমী' বলে সর্বজনস্বীকৃত।
কালিকাপুরাণের অকাট্য প্রমাণ
শাক্ত দর্শনের অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ 'কালিকাপুরাণ'-এ দুর্গাপূজার প্রতিটি তিথির নাম ও বিধি স্পষ্ট করা আছে:
ষষ্ঠী ও সপ্তমীর উল্লেখ: কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে, "বোধয়েদ্বিল্বশাখাসু ষষ্ঠ্যাং দেবী ফলেষু চ" এবং "সপ্তম্যাং বিল্বশাখাং তামাহৃত্য প্রতিপূজয়েৎ"। এখানে কেবল 'ষষ্ঠী' ও 'সপ্তমী' বলা হয়েছে।
অষ্টমী ও নবমীর উল্লেখ:
"আশ্বিনস্য তু শুক্লস্য ভবেদ্ যা অষ্টমী তিথিঃ। মহাষ্টমীতি সা প্রোক্তা দেব্যাঃ প্রীতিকরী পরা।। ততেঽনু নবমী যা স্যাৎ সা মহানবমী স্মৃতা।" (আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি দেবীর কাছে অত্যন্ত প্রীতিকর বলে তা ‘মহাষ্টমী’ নামে খ্যাত এবং এর ঠিক পরের নবমী তিথিটি ‘মহানবমী’ নামে পরিচিত।)
সন্ধিপূজা: মহাষ্টমী ও মহানবমীর মেলবন্ধন
অষ্টমী ও নবমীর 'মহা' হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় শাস্ত্রীয় কারণ হলো সন্ধিপূজা। মহাষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট— এই ৪৮ মিনিট হলো সন্ধিক্ষণ।
পুরাণ মতে, ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই দেবী দুর্গা চামুণ্ডা রূপ ধারণ করে চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই মহাসুরকে বধ করেছিলেন।
শক্তির এই সর্বোচ্চ প্রকাশ ও আসুরিক শক্তির বিনাশের এই কালটি সাধারণ কোনো সময় নয়, এটি একটি মহাজাগতিক মুহূর্ত। এই সন্ধিক্ষণ ধারণ করে বলেই অষ্টমী ও নবমী তিথি 'মহা' অভিধা পেয়েছে।
চতুষ্কর্মের তত্ত্ব
দুর্গাপূজার মূল প্রাণ নিহিত রয়েছে 'চতুষ্কর্ম'-এর মধ্যে। এগুলো হলো— স্নপন (মহাস্নান), পূজন, বলিদান (অহং ও কাম-ক্রোধাদি রিপু বলি) এবং হোম। লিঙ্গপুরাণ অনুসারে, এই চারটি মহা কর্ম কেবল অষ্টমী ও নবমীতেই সম্পূর্ণভাবে সম্পাদিত হয়। পূজার এই পূর্ণাঙ্গ রূপের কারণেই কেবল এই দুই তিথি 'মহা' আখ্যা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।
সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড বনাম সনাতনী ঐতিহ্য
বর্তমানে বাণিজ্যিকীকরণের যুগে পূজার প্রতিটি দিনকেই উৎসবের মোড়কে বিক্রি করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞাপনের ভাষায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-শেয়ারের হুজুগে পড়ে আমরা 'মহাপঞ্চমী' বা 'মহাষষ্ঠী' বলে নিজেদের শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটাচ্ছি।
সনাতন ধর্ম বিজ্ঞান, যুক্তি ও দর্শনের ধর্ম। আমাদের প্রতিটি আচার, শব্দ ও রীতির পেছনে গভীর শাস্ত্রীয় কারণ রয়েছে। না জেনে ট্রেন্ডের বশবর্তী হয়ে এই অপপ্রয়োগ কেবল ভুলই নয়, এটি আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি একধরনের অবজ্ঞাও বটে।
MandirBD-এর বার্তা
আসুন, আমরা নিজেরা শাস্ত্র জানি এবং পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা দিই। এবারের শারদীয়া দুর্গাপূজায় মাতৃবন্দনার পাশাপাশি আমরা যেন শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা বজায় রাখি। দশমীতে যেমন আমরা 'বিজয়া দশমী' বলি, ঠিক তেমনি ষষ্ঠী বা সপ্তমীতে নয়, কেবল অষ্টমী ও নবমীতেই আমরা উচ্চারণ করি "শুভ মহাষ্টমী" বা "শুভ মহানবমী"।
সনাতন সংস্কৃতির সঠিক তথ্য ও আপনার চারপাশের যেকোনো মন্দিরের খোঁজ পেতে, এবং ধর্মীয় জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে যুক্ত থাকুন MandirBD-এর সাথে। ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ।
মতামত দিন
মতামত দিতে লগইন করুন।
0 টি মতামত
কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
