ভাইফোঁটা হলো কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় ভাইয়ের কপালে বোনের ফোঁটা দেওয়ার উৎসব, ভাইয়ের দীর্ঘ জীবন আর মঙ্গল কামনায়। এর শাস্ত্রীয় নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, তিথিটির আরেক নাম যমদ্বিতীয়া; হিন্দিভাষী অঞ্চলে একই দিন ভাইদুজ, নেপালে ভাইটিকা নামে পরিচিত।
২০২৬ সালে ভাইফোঁটা পঞ্জিকা মতে ২৪ কার্তিক ১৪৩৩, বুধবার (১১ নভেম্বর)। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা অনুযায়ী ফোঁটা দিতে হয় বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৪১ মিনিটের মধ্যে। তিথির শুরু-শেষ আর দুই গণনার সময় একসঙ্গে আছে ভাইফোঁটা ২০২৬ কবে: তারিখ ও সময়সূচি লেখায়।
ভাইফোঁটা কী, কেন ভ্রাতৃদ্বিতীয়া
কালী পূজার অমাবস্যার পর শুক্লপক্ষ শুরু হয়, আর তার দ্বিতীয় তিথিতে ভাইফোঁটা। এ বছর শ্যামা পূজা ২১ কার্তিক, রবিবার (৮ নভেম্বর); তার দুদিন পর, ২৪ কার্তিক, বুধবার (১১ নভেম্বর) ভাইফোঁটা।
"ভ্রাতৃ" মানে ভাই, "দ্বিতীয়া" মানে তিথি; দুয়ে মিলে ভাইয়ের জন্য পালিত দ্বিতীয়া। লোকমুখে নাম ভাইফোঁটা, কারণ এ দিনের মূল আচার কপালে ফোঁটা দেওয়া। বানানে অনেকে ভাইফোটাও লেখেন; একই উৎসব।
বাংলাপিডিয়া একে হিন্দুসমাজের লোকউৎসব বলেছে। শাস্ত্রের বিধানের পাশাপাশি এর বড় অংশ পারিবারিক: ফোঁটা, আশীর্বাদ, উপহার আর একসঙ্গে খাওয়া।
যম ও যমুনার কাহিনি
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে যম আর যমুনা ভাইবোন, সূর্য ও সংজ্ঞার সন্তান। কাহিনি অনুযায়ী, কার্তিকের শুক্লা দ্বিতীয়ায় যমুনা ভাই যমকে নিজের ঘরে ডেকে পূজা ও আপ্যায়ন করেন। খুশি হয়ে যম বোনকে বর দিতে চাইলে যমুনা চান, প্রতি বছর এই তিথিতে বোনেরা ভাইয়ের মঙ্গল কামনা করলে তাদের ভাইয়ের অকালমৃত্যু হবে না।
সেই থেকে এই তিথির নাম যমদ্বিতীয়া, আর বোনেরা এদিন ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে যমের দুয়ারে "কাঁটা" দেন, এমনটাই বিশ্বাস। কাহিনির নানা রূপ আছে; কোনো কোনো বর্ণনায় কৃষ্ণ ও সুভদ্রার কথাও আসে। এগুলো পুরাণকথা ও লোকবিশ্বাস হিসেবেই পড়ুন।
পঞ্জিকায় ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার বিধান
বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা ১৪৩৩-এ ২৪ কার্তিক, বুধবারের পাতায় দিনটির বিধান এভাবে ছাপা:
"যম-যমুনা-চিত্রগুপ্ত ও যমদূত পূজা। যমার্ঘ্যদান। ভগিনী কর্তৃক ভ্রাতৃ পূজা। আচারবশতঃ ভ্রাতৃললাটে তিলকদান। ভ্রাতাও ভগিনীকে বস্ত্রাদি দান করিবে। ভগিনী হস্তে ভোজন কর্তব্য। গোস্বামিমতে যমদ্বিতীয়া ও মধ্যাহ্নে শ্রীশ্রীযমরাজ (ধর্মরাজ) পূজা।"
সহজ কথায়: এদিন যম, যমুনা, চিত্রগুপ্ত ও যমদূতের পূজা আর যমের উদ্দেশে অর্ঘ্য দেওয়ার বিধান। বোন ভাইকে পূজা করেন, আর প্রচলিত রীতি হিসেবে ভাইয়ের কপালে তিলক বা ফোঁটা দেন। ভাইও বোনকে কাপড়চোপড় উপহার দেবেন, আর বোনের হাতে খাবেন। বৈষ্ণব গোস্বামী মতে দিনটি যমদ্বিতীয়া, দুপুরে যমরাজের (ধর্মরাজ) পূজা হয়।
একই পাতায় ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার কৃত্য "দিবা ঘ ২।১১ মধ্যে", অর্থাৎ ভারতীয় সময় দুপুর ২টা ১১ মিনিটের মধ্যে করতে বলা হয়েছে। পঞ্জিকায় সময় ভারতীয় সময়ে ছাপা; বাংলাদেশ সময়ে ৩০ মিনিট যোগ করে দুপুর ২টা ৪১ মিনিট।
কেন ১১ নভেম্বর, ১০ নভেম্বর নয়
দ্বিতীয়া তিথি লাগে আগের দিন দুপুরে: প্রচলিত গণনায় ২৩ কার্তিক (১০ নভেম্বর) দুপুর ১টা ৭ মিনিটে, দৃক্ গণনায় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে (দুটোই বাংলাদেশ সময়)। তাই কেউ কেউ ১০ নভেম্বরকে ভাইফোঁটার দিন বলেন। কিন্তু সূর্যোদয়ের সময় দ্বিতীয়া থাকে ২৪ কার্তিক (১১ নভেম্বর), আর বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ওই দিনেই দিয়েছে; বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতের প্রকাশিত হিসাবও একই দিন বলে। প্রচলিত গণনায় দ্বিতীয়া শেষ হয় ১১ নভেম্বর দুপুর ২টা ৪১ মিনিটে, দৃক্ গণনায় বিকেল ৪টা ২৩ মিনিটে।
ভাইফোঁটা কিভাবে দিতে হয়: ধাপে ধাপে
নিচের ক্রম প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সাজানো। পরিবারভেদে খুঁটিনাটি আলাদা; আপনার বাড়ির রীতি থাকলে সেটাই আগে।
- উপবাস: প্রচলিত রীতিতে বোন সকাল থেকে উপবাস রেখে ভাইকে ফোঁটা দেন, তারপর খান। সব পরিবারে উপবাসের নিয়ম এক নয়।
- থালা সাজানো: ফোঁটার জন্য চন্দন; অনেক পরিবারে ঘি, দই বা প্রদীপের পোড়া পলতের কাজলও লাগে। সঙ্গে প্রদীপ, ধান আর দূর্বা, মিষ্টি, আর ভাইয়ের জন্য উপহার।
- আসন: ভাইকে আসনে বসিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়।
- ফোঁটা: বোন বাঁ হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেন। অনেক পরিবারে তিনবার ফোঁটা দেওয়া হয়, প্রতিবার ছড়া বলে। ছড়াটি নিচে দেওয়া আছে।
- আশীর্বাদ: ধান ও দূর্বা মাথায় দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। প্রচলিত রীতিতে বড় বোন ছোট ভাইকে আশীর্বাদ করেন, আর বয়সে ছোট বোন বড় ভাইকে প্রণাম করেন।
- মিষ্টিমুখ ও উপহার: ফোঁটার পর মিষ্টিমুখ। বোন ভাইকে নতুন কাপড় বা উপহার দেন; পঞ্জিকার বিধান মেনে ভাইও বোনকে কাপড়চোপড় বা উপহার দেন।
- ভোজ: বোনের হাতে ভাইয়ের খাওয়া এ দিনের অংশ; অনেক বাড়িতে দুপুর বা রাতে বড় ভোজের আয়োজন হয়।
ভাইফোঁটার ছড়া
ফোঁটা দেওয়ার সময় বোনেরা যে ছড়া বলেন, বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা তা "ভ্রাতৃদ্বিতীয়ায় প্রচলিত বাংলা প্রবচন" হিসেবে ছেপেছে:
ভায়ের কপালে দিলাম ফোঁটা।
যমের দুয়ারে পড়লো কাঁটা।।
যমুনা দেন যমকে ফোঁটা।
আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।।
যম যেমন হন চিরজীবী।
আমার ভাই যেন হয় তেমন চিরজীবী।
ছড়ার মানে সোজা: যমুনা যেমন ফোঁটা দিয়ে ভাই যমের অমরত্ব চেয়েছিলেন, বোনও তেমনি ভাইয়ের দীর্ঘ জীবন চান। পরিবার আর অঞ্চলভেদে ছড়াটির আরও লম্বা পাঠ প্রচলিত, শব্দেও কিছু তফাত আছে। আপনার বাড়িতে যে পাঠ চলে আসছে, সেটাই বলুন।
প্রশ্নোত্তর
ভাইফোঁটা কি?
কার্তিকের শুক্লা দ্বিতীয়ায় ভাইয়ের দীর্ঘ জীবন কামনা করে বোনের ফোঁটা দেওয়ার উৎসব। এর আরেক নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া; তিথিটি যমদ্বিতীয়া নামেও পরিচিত।
ভাইফোঁটা কিভাবে দিতে হয়?
প্রচলিত রীতিতে ভাইকে আসনে বসিয়ে প্রদীপ জ্বেলে বোন বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে চন্দনের ফোঁটা দেন, ছড়া বলেন, ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। তারপর মিষ্টিমুখ, উপহার আর ভোজ। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মতে ২০২৬ সালে ফোঁটা দুপুর ২টা ৪১ মিনিটের (বাংলাদেশ সময়) মধ্যে।
ভাইফোঁটার ছড়া কী?
পঞ্জিকায় ছাপা প্রচলিত পাঠ শুরু হয় "ভায়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়লো কাঁটা" দিয়ে, শেষ হয় ভাই যেন যমের মতো চিরজীবী হয়, এই কামনায়। পুরো ছড়া ওপরে দেওয়া আছে।
ভাইফোঁটায় বোন কি উপবাস রাখেন?
প্রচলিত রীতিতে অনেক বোন ফোঁটা দেওয়া পর্যন্ত উপবাস রাখেন, তারপর খান। এটি পারিবারিক রীতি; সবার জন্য একই নিয়ম নেই।
ভাইফোঁটা আর ভাইদুজ কি এক?
হ্যাঁ, একই তিথির উৎসব। বাংলায় ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, হিন্দিভাষী অঞ্চলে ভাইদুজ, নেপালে ভাইটিকা। নাম আর আচারে কিছু তফাত আছে, মূল কামনা একই: ভাইয়ের মঙ্গল।
এই বিষয়ে আরও পড়ুন
সূত্র
- তারিখ, সময় ও বিধান, প্রচলিত ছড়া: বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা ১৪৩৩, ২৪ কার্তিকের পাতা (ছাপা পাতা, ভারতীয় সময়)।
- দ্বিতীয়া তিথির শুরু, প্রচলিত গণনা: আজতক বাংলা, ২২ অক্টোবর ২০২৬ (বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা উদ্ধৃত); দৃক্ গণনা: মন্দিরবিডি পঞ্জিকা, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ (১১ নভেম্বর ২০২৬)।
- উৎসবের পরিচয়, যম-যমুনার কাহিনি, উপবাস ও ফোঁটার রীতি: বাংলাপিডিয়া, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।
- ফোঁটার উপকরণ, কড়ে আঙুল, ধান-দূর্বায় আশীর্বাদ, কাহিনির রূপভেদ: প্রথম আলো, "পারিবারিক সৌভ্রাতৃত্বের উৎসব ভাইফোঁটা", ২৩ অক্টোবর ২০২৫।
মতামত দিন
মতামত দিতে লগইন করুন।
0 টি মতামত
কোনো মতামত নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!