দেবী মনসা হলেন সনাতন পৌরাণিক ও বাঙালি লোকসংস্কৃতির এক বিশিষ্ট দেবী, যাঁকে সর্পদেবী, বিষের অধিষ্ঠাত্রী দেবী (বিষহরী), পদ্মাবতী এবং নাগমাতা জরৎকারুপ্রিয়া হিসেবে পূজা করা হয়। পৌরাণিক শাস্ত্র অনুযায়ী তিনি মহর্ষি কশ্যপ ও কদ্রুর কন্যা (লোকবিশ্বাসে মহাদেবের মানসকন্যা), নাগরাজ বাসুকীর ভগিনী, মহর্ষি জরৎকারুর পত্নী এবং মহাভারতের সর্পযজ্ঞ নিবারণকারী ঋষি আস্তীকের মাতা। প্রতিমা হিসেবে তিনি সাধারণত সর্পভূষিতা, চতুর্ভুজা বা দ্বিভুজা এবং হংস বা পদ্মাসনে উপবিষ্টা রূপে পূজিত হন। বহু স্থানে প্রতিমার পাশাপাশি 'সিজ বৃক্ষ' (Euphorbia neriifolia)-এর ডাল বা মনসার ঘট স্থাপন করে তাঁর আরাধনা করা হয়।
(সূত্র: ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ - প্রকৃতি খণ্ড; দেবীভাগবত পুরাণ - নবম স্কন্ধ; মনসামঙ্গল কাব্য)

মনসা পুজা
Manasa Puja
সর্বশেষ
মঙ্গল, ১৮ আগস্ট
পরিচয়
ধর্মীয় তাৎপর্য
মনসা পূজার মূল তাৎপর্য হলো বিষ ও সর্পভয় থেকে মুক্তি লাভ, রোগব্যাধি নিরাময় এবং পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি ও সন্তানসন্ততির কল্যাণ নিশ্চিত করা। নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান বাংলায় বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই পূজার সামাজিক ও ব্যবহারিক গুরুত্ব সুগভীর। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি 'মনসামঙ্গল কাব্য' (বিজয় গুপ্ত, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ রচিত)-এ চাঁদ সওদাগরের উপাখ্যান ও সতী বেহুলার আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেবী মনসার অপ্রতিরোধ্য মহাশক্তি ও ভক্তির মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া পৌরাণিক দৃষ্টিতে তিনি মহাভারতের সর্পযজ্ঞ থামিয়ে সমগ্র নাগকুলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষাকারী পরম দেবী। (সূত্র: মহাভারত - আদিপর্ব/আস্তীক পর্ব; শ্রীবিজয় গুপ্ত রচিত 'পদ্মাপুরাণ'; কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ রচিত 'মনসামঙ্গল')
আচার-অনুষ্ঠান
পূজার সময়কাল: মনসা পূজা মূলত আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের নাগ পঞ্চমী তিথিতে এবং ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে (কন্যা সংক্রান্তি/রান্না পুজো) মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। বহু পরিবারে সমগ্র শ্রাবণ মাস জুড়ে নিত্য ঘটপূজাও চলে।
বেদী ও উপচার: পূজাস্থলে মাটির প্রতিমা বা মনসার ঘট স্থাপন করে তাতে 'সিজ' গাছের ডাল রাখা হয়। প্রধান নৈবেদ্য হিসেবে কাঁচা দুধ, পাকা কলা, মুড়ি, খই, বাতাসা, শসা এবং দুধ-কলা নিবেদন করা হয়।
অরন্ধন ও রান্না পূজা: ভাদ্র সংক্রান্তির মনসা পূজায় বাংলা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে 'অরন্ধন' ব্রত পালিত হয়। পূজার আগের দিন রাতে রকমারি ব্যঞ্জন, ভাজাভুজি, ডাল ও ইলিশ মাছ রান্না করে রাখা হয়। পূজার দিন উনুন জ্বালানো নিষিদ্ধ থাকে এবং দেবীকে বাসি ভোগ নিবেদনের পর সকলে পান্তা ভাত ও সেই বাসি অন্ন প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন।
গীত ও আখ্যান পাঠ: পূজার অংশ হিসেবে গ্রামীণ জনপদে সারা রাতব্যাপী 'পদ্মাপুরাণ', 'মনসার ভাসান' বা কবিগান পরিবেশনের সুদীর্ঘ লোকঐতিহ্য রয়েছে। (সূত্র: রঘুনন্দন প্রণীত 'তিথিতত্ত্ব'; বিজয় গুপ্তের পদ্মাপুরাণ; বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি সমীক্ষা)
মনসা পুজা কবে?
এই উৎসব কোথায় হয়
কোন কোন মন্দিরে মনসা পুজা পালিত হয়, তা আমরা এখনো জানি না।
মনসা পুজা পালিত হয় এমন কোনো মন্দির চেনেন?
এখনো কোনো উত্তর নেই
এই বিষয়ে প্রশ্ন করুন →সম্পর্কিত দেবতা

মনসা
মন্দির দেখুন →
সচরাচর জিজ্ঞাসা
মনসা পুজা কবে?
মনসা পুজা সর্বশেষ মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পালিত হয়েছিল (ষষ্ঠী)।
মনসা পূজা কি শুধু সর্পদংশনের ভয় থেকে রক্ষা পেতে করা হয়?
না। মনসা পূজার উদ্দেশ্য শুধু সর্পদংশন থেকে রক্ষা পাওয়া নয়, বরং বিষক্রিয়া নিরাময়, রোগমুক্তি, পরিবারের কল্যাণ, সন্তান লাভ এবং সমৃদ্ধি কামনা করা। দেবীকে বিষহরী হিসেবে পূজা করা হলেও তাঁর আরাধনা আরও ব্যাপক জীবনধারণের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য।
মনসা পূজায় প্রতিমার পরিবর্তে ঘট বা সিজ গাছের ডাল ব্যবহারের কারণ কী?
মনসা দেবীর প্রতিমা নির্মাণের পরিবর্তে ঘট বা সিজ গাছের ডাল ব্যবহারের পেছনে লোকবিশ্বাস হলো, ঘট বা সিজ বৃক্ষ তাঁর স্বয়ং প্রকাশিত রূপ। সিজ বৃক্ষ বিষ প্রতিরোধী বলে বিবেচিত হয় এবং ঘটকে জলময় জীবনশক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এছাড়া সহজলভ্যতা ও ধর্মীয় বিধানের কারণে এই বিকল্প পদ্ধতি প্রচলিত।
ভাদ্র সংক্রান্তির মনসা পূজায় 'অরন্ধন' পালনের তাৎপর্য কী?
অরন্ধন অর্থ অগ্নি প্রজ্জ্বলন না করা। ভাদ্র সংক্রান্তির এই ব্রতে পূর্বরাতে রান্না করে রাখা হয় এবং পরদিন পূজার পর সেই বাসি অন্ন প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই প্রথা দ্বারা জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও ত্যাগের শিক্ষা দেওয়া হয়, সেইসঙ্গে দেবীর প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মনসা পূজায় কি প্রাণী বলি দেওয়া হয়?
না, মনসা পূজায় সাধারণত প্রাণী বলি দেওয়া হয় না। পূজায় ব্যবহৃত প্রধান নৈবেদ্য হলো দুধ, কলা, মুড়ি, খই, বাতাসা, শসা প্রভৃতি নিরামিষ সামগ্রী। তবে কিছু অঞ্চলে বা ব্যক্তিগতভাবে মুরগি বলি দেওয়ার প্রথা প্রচলিত থাকলেও তা সর্বজনীন নয়।
মনসা পূজা কি শুধু গ্রামীণ এলাকাতেই পালিত হয়?
না, মনসা পূজা গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও পালিত হয়। শহর এলাকায় অনেক পরিবার একত্রিত হয়ে মণ্ডপ বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পূজা আয়োজন করেন। তবে গ্রামীণ এলাকায় পূজার আয়োজন ও লোকঐতিহ্য যেমন গীত ও কবিগান পরিবেশন অধিকতর প্রাণবন্ত থাকে।
মনসা পূজায় মহিলাদের ভূমিকা কী থাকে?
মহিলারা মনসা পূজার প্রধান আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী। তাঁরা ঘট বা প্রতিমা স্থাপন, উপচার সাজানো, প্রসাদ প্রস্তুত করা এবং পূজার বিধি অনুসারে পূজা সম্পাদনের কাজে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে মহিলারাই পূজার গান বা স্তোত্র আবৃত্তি করেন।
মনসা পূজার সময় কি বিশেষ কোনো পোশাক পরিধান করতে হয়?
না, মনসা পূজার সময় কোনো বিশেষ পোশাক পরিধানের নির্দিষ্ট বিধি নেই। তবে সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাদাসিধে পোশাক পরিধান করা হয়। অনেক মহিলা লাল বা হলুদ রঙের শাড়ি পরিধান করেন, যা উৎসবের আনন্দ ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
মনসা পূজায় কোন ধরনের গান বা স্তোত্র গাওয়া হয়?
মনসা পূজায় প্রধানত 'মনসামঙ্গল' কাব্যের অংশবিশেষ, 'মনসার ভাসান' গান এবং বিভিন্ন লোকগীতি গাওয়া হয়। এসব গানে দেবীর মহিমা, তাঁর শক্তি ও ভক্তির জয়গাথা বর্ণিত থাকে। অনেক স্থানে সারা রাত ধরে গানবাজনা ও কবিগান পরিবেশিত হয়।
মনসা পূজায় অংশগ্রহণের জন্য কোন ধরনের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি প্রয়োজন?
পূজায় অংশগ্রহণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে শুদ্ধতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা জরুরি। স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা উচিত। পূজাস্থলে প্রবেশের পূর্বে হাত-মুখ ধৌত করা এবং মনকে শুদ্ধ রাখা প্রয়োজন। অনেকেই পূজার পূর্বে ব্রত বা উপবাস পালন করেন।
মনসা পূজার পর প্রসাদ হিসেবে কী কী বিতরণ করা হয়?
মনসা পূজার পর প্রসাদ হিসেবে সাধারণত দুধ, কলা, মুড়ি, খই, বাতাসা, শসা এবং অন্যান্য মিষ্টান্ন বিতরণ করা হয়। ভাদ্র সংক্রান্তির অরন্ধন ব্রত পালনকারী পরিবারে বাসি ভাত ও পূর্বরাতে রান্না করা ব্যঞ্জন প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয়।