সনাতন ভক্তিমার্গীয় প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ এবং পঞ্জিকার ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, পরম সিদ্ধপুরুষ বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ আগস্ট (১১৩৭ বঙ্গাব্দের ১৮ ভাদ্র) ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের পবিত্র অষ্টমী তিথিতে—অর্থাৎ পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পুণ্য আবির্ভাব লগ্নে—ধরাধামে আবির্ভূত হন। তিনি অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার অন্তর্গত চৌরাশী চাকলা নামক নিভৃত পল্লীতে এক কুলীন কাশ্যপ গোত্রীয় নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামনারায়ণ ঘোষাল ছিলেন কঠোর ধার্মিক ব্যক্তি, যাঁর অন্তরে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল সংসারের এক পুত্রকে ঈশ্বরের চরণে পূর্ণাঙ্গ সন্ন্যাসী হিসেবে উৎসর্গ করার। মাতা কমলাদেবীর গর্ভে চতুর্থ পুত্ররূপে লোকনাথ বাবার জন্ম হলে পিতার সেই অভিলাষ পূর্ণ হয়। বাল্যকালেই তিনি তাঁর বাল্যসখা বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত কুলগুরু এবং তৎকালীন প্রখ্যাত তন্ত্র ও বেদজ্ঞ পণ্ডিত ভগবান গাঙ্গুলির হস্তে সমর্পিত হন। এরপর শুরু হয় তাঁর সুদীর্ঘ ও কঠোর ব্রহ্মচর্য জীবন, যেখানে শাস্ত্রজ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি গুরুর নির্দেশনায় হিমালয়ের গভীর তুষারাবৃত প্রান্তরে শতাব্দীব্যাপী যোগ ও অষ্টাঙ্গ তপস্যার সূচনা ঘটেছিল।

লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি
Baba Lokenath's Appearance Day
সর্বশেষ
শুক্র, ৪ সেপ্টেম্বর
পরিচয়
ধর্মীয় তাৎপর্য
সনাতন সমাজে বাবা লোকনাথের আবির্ভাব তিথির তাৎপর্য কেবল কোনো মহাত্মার জন্মদিন পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শৈব এবং বৈষ্ণব সাধনার এক দুর্লভ ও অলৌকিক মিলনভূমি। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে দেবাদিদেব মহাদেব স্বয়ং মানবজাতিকে সংসারযাতনা ও কলিযুগের পাপ থেকে মুক্তি দিতে লোকনাথ রূপ পরিগ্রহ করেছিলেন, আর তাঁর সেই আবির্ভাব ঘটেছিল বৈষ্ণব ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুণ্য জন্মাষ্টমী তিথিতে। হিমালয়ের তুষারশিখরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে যোগী চরম নির্বিকল্প সমাধির প্রশান্তি লাভ করেছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে বারদী আশ্রমে একজন মমতাময় পিতারূপে সমাজের সর্বস্তরের দীন-দরিদ্র ও আর্ত মানুষের মধ্যে প্রেম ও নিরাময় বিতরণ করেছিলেন। এই পুণ্যলগ্নে ভক্তরা বাবার সেই অভয়দানকারী বাণী অন্তরের গভীরে স্মরণ করেন—"রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।" এই দিবসটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে তীব্র কৃচ্ছ্রসাধন ও ব্রহ্মচর্যের লক্ষ্য কেবল আত্মমুক্তি নয়, বরং পৃথিবীর প্রতিটি জীবের মধ্যে ঈশ্বরের রূপ দর্শন করে পরম করুণার সাথে সেবা প্রদান করা।
আচার-অনুষ্ঠান
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় অতি প্রত্যুষে মহাদেবের বিশেষ অভিষেক ও আরাধনার মধ্য দিয়ে, কারণ শিবের প্রসন্নতা ব্যতিরেকে লোকনাথ বাবার প্রকৃত অর্চনা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। পূজার বেদিতে বাবার প্রতিকৃতির সম্মুখে ভক্তরা নিবেদন করেন তাঁর পরম প্রিয় উজ্জ্বল নীল শালুক (নীল শাপলা), সুগন্ধযুক্ত শুভ্র স্থলপদ্ম, বেলপাতা ও তুলসীপত্র। প্রাতঃকালে অনুষ্ঠিত হয় "বাল্যভোগ", যাতে ক্রিস্টালাইন মিছরি, তালশাঁস, পাকা তাল, কালোজাম ও নানাবিধ রসালো ফল অর্পণ করা হয়; এরপর দ্বিপ্রহরে নিবেদন করা হয় বৈদিক রীতির শুদ্ধ নিরামিষ "রাজভোগ", যেখানে সাধারণ চাল-মুগডালের আতপ খিচুড়ি, লাবড়া, মোচার ঘণ্ট এবং মিষ্টান্ন সাজিয়ে দেওয়া হয়। সারাদিন ধরে মন্দির ও গৃহকোণে ভক্তগণ শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবার পাঁচালী পাঠ, গুরুস্তোত্র, শিব মহিম্ন স্তোত্র এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে "জয় বাবা লোকনাথ, জয় ব্রহ্ম লোকনাথ, জয় শিব লোকনাথ, জয় গুরু লোকনাথ" তারকব্রহ্ম নাম সংকীর্তনে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক বারদী ধাম এবং পশ্চিমবঙ্গের চাকলা ধামে এই উপলক্ষে বৈদিক হোম-যজ্ঞ, আকাশ-বাতাস মুখরিত করে ভক্তদের মাঝে চিনির বা বাতসার হরিলুট এবং হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে অন্নপ্রসাদ বিতরণের মহোৎসব আয়োজিত হয়।
উপবাসের নিয়ম
যেহেতু লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি হুবহু শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী তিথিতে উদযাপিত হয়, তাই এর ব্রতপালনের বিধান সনাতন শাস্ত্রের জন্মাষ্টমী ব্রতসংহিতার অনুসারেই কঠোর নিষ্ঠায় পালন করা হয়। ব্রতপালনকারী ভক্তগণ সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকেই সংকল্প গ্রহণ করে সমগ্র দিন ও রাত্রি অন্ন, ডাল, লবণ, শস্য এবং সাধারণ রান্নাকরা খাদ্য বর্জন করে থাকেন। ভক্তদের শারীরিক সামর্থ্য বিবেচনা করে এই উপবাস দুইভাবে পালিত হয়—উচ্চমার্গীয় ভক্তরা সারাদিন সম্পূর্ণ জলস্পর্শহীন "নির্জলা" উপবাস ধারণ করেন, আর যারা অক্ষম তারা বাবার চরণে নিবেদিত বিশুদ্ধ দুধ, জল, ছানা ও ফলমূল সহযোগে "ফলাহারী" উপবাস পালন করেন। মধ্যরাত্রিতে জন্মাষ্টমীর মূল পূজার সমাপনে বাবার চরণে উৎসর্গীকৃত মিছরি ও চরণামৃত পান করে সাময়িক ব্রতরক্ষা করা হয়, তবে অন্নগ্রহণের কঠোর নিষেধ থাকে। পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের পর তিথির অবসান হলে যথাবিহিত শাস্ত্রীয় আচার, পঞ্চোপচার পূজা এবং ব্রাহ্মণ বা অতিথি সেবার পর ভক্তরা অন্ন গ্রহণ করে বিধিমতো "পারণ" সম্পন্ন করেন; এই ব্রতে শারীরিক অনশনকে বাহ্যিক মাধ্যম মেনে কায়-মন-বাক্যের অহিংসা, ইন্দ্রিয় সংযম ও ঈশ্বরভাবনাতেই চিত্ত নিমগ্ন রাখাকে সর্বোচ্চ ধর্ম বলে বিবেচনা করা হয়।
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি কবে?
এই উৎসব কোথায় হয়
কোন কোন মন্দিরে লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি পালিত হয়, তা আমরা এখনো জানি না।
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি পালিত হয় এমন কোনো মন্দির চেনেন?
এখনো কোনো উত্তর নেই
এই বিষয়ে প্রশ্ন করুন →তথ্য
ধরন
পূজা
সময়কাল
১ দিন
সচরাচর জিজ্ঞাসা
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি কবে?
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি সর্বশেষ শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পালিত হয়েছিল (অষ্টমী)।