রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার সময় সবার আগে যে সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাটি চোখে পড়ে, সেটিই হলো 'বড় শিব মন্দির' বা ভুবনেশ্বর শিব মন্দির। এটি একটি পঞ্চরত্ন বা পাঁচটি চূড়াবিশিষ্ট মন্দির, যা উত্তর ভারতের মন্দির স্থাপত্যশৈলীর এক চমৎকার নিদর্শন। মন্দিরটি শিব সাগর নামক একটি সুবিশাল দীঘির দক্ষিণ পাড়ে অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। এই মন্দিরটি একটি উঁচু বর্গাকার বেদির বা মঞ্চের ওপর নির্মিত। এই বেদির উচ্চতা প্রায় ৪ মিটার (১৩ ফুট)। পুরো মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৩৫.০৫ মিটার বা ১১৫ ফুট, যা একে পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্সের অন্যতম সর্বোচ্চ স্থাপনায় পরিণত করেছে। মন্দিরটির প্রতিটি তলার আয়তন ৩৯২.৪৫ বর্গমিটার এবং মূল কাঠামোটি সম্পূর্ণ ইট ও সুরকির সাহায্যে নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের স্থাপত্যে 'পঞ্চরত্ন' রীতির নিখুঁত ব্যবহার দেখা যায়। এখানে চার কোণে চারটি ছোট চূড়া বা রত্ন রয়েছে এবং ঠিক মাঝখানে একটি বৃহৎ চূড়া রয়েছে, যা পিরামিড আকৃতির এবং ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে। প্রতিটি চূড়ার মাথায় নান্দনিক কারুকাজ করা ফিনিয়াল বা সূঁচালো শীর্ষস্থান রয়েছে। মন্দিরটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রশস্ত ও উন্মুক্ত টানা বারান্দা। বারান্দায় প্রবেশের জন্য প্রতিটি দিকে পাঁচটি করে দৃষ্টিনন্দন খিলান বা আর্চ রয়েছে, যা রাজস্থানি বা জয়পুরী স্থাপত্যের একটি সুস্পষ্ট প্রভাব বহন করে। মন্দিরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে প্রধান প্রবেশপথ, যেখানে বেদিতে ওঠার জন্য একটি সুপ্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। এছাড়া উত্তর দিক থেকেও শিব সাগরের বাধানো ঘাটে নামার জন্য একটি চমৎকার সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দিরের ভেতরের গর্ভগৃহে স্থাপিত রয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গটির আকার এবং এর চারপাশের পাথরের খোদাই করা কারুকাজ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। মন্দিরের বাইরের দিকের দেয়ালগুলো একসময় অসংখ্য অপূর্ব টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সুসজ্জিত ছিল। এসব টেরাকোটায় হিন্দু পুরাণের নানা কাহিনী, দেবদেবীর মূর্তি, রামায়ণ ও মহাভারতের দৃশ্য এবং তৎকালীন বাংলার সামাজিক জীবনের নানা চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। যদিও ১৯৭১ সালে এর অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও টিকে থাকা টেরাকোটার কাজগুলো আজও বাংলার প্রাচীন মৃৎশিল্প ও স্থাপত্য শৈলীর এক অনবদ্য স্বাক্ষর বহন করে। সামগ্রিকভাবে, বড় শিব মন্দির কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকেও বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ।

বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির)
পুঠিয়া ইউনিয়ন, পুঠিয়া, রাজশাহী
Boro Shiva Temple (Bhubaneshwar Temple)
দর্শনের আগে
বিবরণ
ইতিহাস
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় অবস্থিত 'বড় শিব মন্দির' বা 'ভুবনেশ্বর মন্দির' বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক একটি হিন্দু মন্দির। এই সুবিশাল এবং অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক মন্দিরটির ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এবং এটি পুঠিয়ার পাঁচআনি জমিদার রাজপরিবারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল। আঠারো শতকের প্রথম ভাগে পুঠিয়ার রাজা জগন্নারায়ণ রায় মৃত্যুবরণ করলে, তার বিধবা পত্নী রাণী ভুবনময়ী দেবী এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে রাণী ভুবনময়ী দেবীর আদেশে এই মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম এবং অগণিত কারিগর ও স্থপতির নিখুঁত কাজের মাধ্যমে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। সে সময়ে মন্দিরটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩ লক্ষ টাকা, যা সেই যুগের অর্থনীতিতে একটি বিশাল অংকের অর্থ ছিল। রাণী ভুবনময়ী দেবীর নামানুসারে একে প্রায়শই ‘ভুবনেশ্বর মন্দির’ নামেও অভিহিত করা হয়। পুঠিয়া রাজপরিবার মূলত বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী হলেও শৈব ধারার প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধাবোধের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন এই মন্দির। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি একটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করে এবং মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে, মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপিত দেশের সবচেয়ে বড় কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গটিকে তারা তুলে ফেলার বা ভেঙে ফেলার অপচেষ্টা চালিয়েছিল, তবে তা তারা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। তবুও, তাদের বর্বর হামলায় মন্দিরের গায়ে থাকা অনেক অমূল্য টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক এবং কারুকাজ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর এই মন্দিরের স্বত্বাধিকার গ্রহণ করে এবং এটিকে একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। আজ পর্যন্ত এই মন্দিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিত পুজো-অর্চনা করে থাকেন। শিবরাত্রি ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের সময় এখানে প্রচুর ভক্তের সমাগম ঘটে। এর ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় ইমারতের ইতিহাস নয়, বরং এটি বাংলার জমিদার প্রথা, তাদের শিল্পানুরাগ এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এক নীরব সাক্ষী।
কীভাবে যাবেন
"ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে রাজশাহী শহরে পৌঁছাতে হবে। রাজশাহী শহরের শিরোইল বাসস্ট্যান্ড বা রেলওয়ে স্টেশন থেকে নাটোরগামী বাসে উঠে প্রায় ৩০-৩২ কিলোমিটার দূরে পুঠিয়া বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। সেখান থেকে ভ্যান বা অটোরিকশায় মাত্র ৫-১০ মিনিটে পুঠিয়া রাজবাড়ি কমপ্লেক্সে পৌঁছানো যায়, যার প্রবেশমুখেই এই বিশাল শিব মন্দিরটি অবস্থিত।
দেবতাগণ
ভ্রমণ তথ্য
অবস্থান ও মানচিত্র
দিকনির্দেশনা পান ↗রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক লিংক রোড, পুঠিয়া বাজার সংলগ্ন, পুঠিয়া ইউনিয়ন, পুঠিয়া, রাজশাহী
গ্যালারি
এখনও কোনো ছবি নেই
এই মন্দিরের প্রথম ছবিটি আপনি যুক্ত করুন।
ভিডিও
রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি ও শিব মন্দির || Temples and Palace of Puthia
মতামত
এখনো কোনো উত্তর নেই
এই বিষয়ে প্রশ্ন করুন →এই প্রোফাইলটি ৭০% সম্পূর্ণ
সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করুনতথ্য সর্বশেষ হালনাগাদ ৭ অক্টো ২০২৬
এই তথ্য কি সঠিক?
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিন
আমাদের ডিজিটাল ঐতিহ্য রক্ষায় সাহায্য করুন। আপনার এলাকার মন্দিরের তথ্য, ছবি বা পঞ্জিকা আপডেট করে আমাদের সাথে যুক্ত হোন।
পয়েন্ট দেওয়ার আগে আপনি মন্দিরে বা মন্দিরের ২০০ মিটারের মধ্যে আছেন কিনা নিশ্চিত করতে লোকেশন প্রয়োজন।
নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবক আবেদন স্বেচ্ছাসেবক ড্যাশবোর্ড থেকে করা যায়।
দেবতাগণ
খোলার সময়
এখনো খোলার সময় যোগ করা হয়নি।
ভ্রমণ তথ্য
অবস্থান ও মানচিত্র
দিকনির্দেশনা পান ↗রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক লিংক রোড, পুঠিয়া বাজার সংলগ্ন, পুঠিয়া ইউনিয়ন, পুঠিয়া, রাজশাহী
রাজশাহী জেলার অন্যান্য মন্দির
সাধারণ প্রশ্ন
বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির) কোথায় অবস্থিত?
বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির) বাংলাদেশের পুঠিয়া ইউনিয়ন, পুঠিয়া, রাজশাহী-এ অবস্থিত। জিপিএস স্থানাঙ্ক নথিভুক্ত থাকলে এই পাতায় ঠিকানা, মানচিত্র ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।
বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির) সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া যায়?
বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির) প্রোফাইলে যাচাই থাকলে ঠিকানা, মানচিত্র, সময়সূচি, ছবি, দেবদেবী, সুবিধা, ইভেন্ট, ইতিহাস, যোগাযোগ ও কমিউনিটি আপডেট থাকতে পারে।
বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির)-এ যাওয়ার দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে?
মানচিত্র কোঅর্ডিনেট থাকলে MandirBD পুঠিয়া ইউনিয়ন, পুঠিয়া, রাজশাহী-এর বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির)-এর জন্য মানচিত্র ও দিকনির্দেশনা লিংক দেখায়, যাতে যাত্রার পরিকল্পনা সহজ হয়।
বড় শিব মন্দির (ভুবনেশ্বর মন্দির) তথ্য কীভাবে সংশোধন করব?
মন্দির পাতার সংশোধন বা দাবি অপশন ব্যবহার করুন। জমা দেওয়া আপডেট প্রকাশের আগে স্বেচ্ছাসেবক ও মডারেটররা রিভিউ করেন।
