মূল বিষয়বস্তুতে যান
সব উৎসব
উৎসবপ্রধান উৎসব৯ দিন

শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা

Jagannath Rath Yatra

জুলাই১৬২০২৬

সর্বশেষ

বৃহঃ, ১৬ জুলাই

দ্বিতীয়া

পরিচয়

রথযাত্রা সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ এবং বর্ণাঢ্য একটি মহোৎসব, যা মূলত ভগবান জগন্নাথ, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলভদ্র এবং ভগ্নী সুভদ্রার সম্মানে অত্যন্ত ভক্তিভরে পালিত হয়। ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরীতে অনুষ্ঠিত এই রথযাত্রা বিশ্ববিখ্যাত হলেও, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে এটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা, উদ্দীপনা ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই পুণ্যলগ্ন উপস্থিত হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে এটি এক মহামিলনমেলার রূপ নেয়। এই পবিত্র দিনে বিশাল আকৃতির এবং অত্যন্ত নিপুণ কারুকাজে সজ্জিত তিনটি পৃথক কাঠের রথে করে ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে শ্রীমন্দির থেকে বের করে আনা হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগমে চারপাশের রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে। ভক্তদের মাঝে এক প্রবল বিশ্বাস কাজ করে যে, পরম করুণাময় ভগবান এদিন সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসার জন্য এবং সকলের দুঃখ-কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে নিজ গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ এই রথ টানার দুর্লভ সুযোগ পান, যা সমাজে এক অনন্য সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের গভীর বার্তা বহন করে।

ধর্মীয় তাৎপর্য

রথযাত্রার আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং সনাতনীদের কাছে এটি পরম পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই মহোৎসবের মূল আকর্ষণ হলো ভগবান জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীর শ্রীমন্দির থেকে তাঁদের মাসির বাড়ি বা গুণ্ডিচা মন্দিরে যাত্রা। শাস্ত্রীয় এবং প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান সেখানে পূর্ণ নয় দিন অবস্থান করেন এবং তারপর 'উল্টো রথ' বা বহুড়া যাত্রার মাধ্যমে অত্যন্ত সসম্মানে ও জাঁকজমকের সাথে নিজ মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন। এই রথযাত্রার সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য হলো ভক্ত ও ভগবানের মধ্যকার সরাসরি এবং বাধাহীন সংযোগ স্থাপন। মন্দিরের প্রথাগত কঠোর নিয়ম ভেঙে ভগবান যখন রাজপথে নেমে আসেন, তখন ধনী-দরিদ্রের সমস্ত ভেদাভেদ মুহূর্তের মধ্যে মুছে যায়। সনাতন ধর্মে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, রথের রশি একবার ভক্তিভরে স্পর্শ করতে পারলে বা টানতে পারলে মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সমস্ত পাপ খণ্ডন হয় এবং সে পরম মোক্ষ বা চিরস্থায়ী মুক্তি লাভ করে। আধ্যাত্মিক দর্শনের দিক থেকে গভীরভাবে বিবেচনা করলে, এই রথ হলো নশ্বর মানবদেহের প্রতীক এবং এর ভেতরে উপবিষ্ট ভগবান হলেন আমাদের শাশ্বত পরমাত্মা। এই মহান উৎসব আমাদের আত্মোপলব্ধি এবং ভক্তিপথের পরম গন্তব্যের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

আচার-অনুষ্ঠান

রথযাত্রার আচার ও পালন অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা হয়। এই উৎসবের সূচনা হয় স্নানযাত্রার মাধ্যমে, যখন ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা দেবীকে পবিত্র জল দিয়ে স্নান করানো হয়। এরপর ভগবান পনেরো দিনের জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে 'অণসর' গৃহে অবস্থান করেন, যাকে বলা হয় অসুস্থতার সময়। এই সময়ে তাঁদের বিশেষ আয়ুর্বেদিক পাচন নিবেদন করা হয়। রথযাত্রার দিন সকালে 'পহণ্ডি' নামক এক বিশেষ শোভাযাত্রার মাধ্যমে দুলিয়ে দুলিয়ে ভগবানকে রথে অধিষ্ঠিত করা হয়। এই মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য ভক্তরা ব্যাকুল হয়ে থাকেন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় 'ছেরাপহরা' নামক এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ আচার, যেখানে স্থানীয় রাজা বা বিশিষ্ট ব্যক্তি সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের চারপাশ পরিষ্কার করেন। এটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রমাণ করে যে ভগবানের চোখে রাজা থেকে প্রজা সবাই সমান এবং এখানে অহংকারের কোনো স্থান নেই। এরপর শঙ্খধ্বনি, খোল-করতাল এবং হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ ভক্ত অত্যন্ত আনন্দ ও ভক্তিপূর্ণ উদ্দীপনার সাথে রথের রশি ধরে টানতে শুরু করেন। গুণ্ডিচা মন্দিরে বা মাসির বাড়িতে পৌঁছানোর পর ভগবান সেখানে নয় দিন অবস্থান করেন এবং ভক্তরা প্রতিদিন তাঁকে নানা সুস্বাদু ভোগ নিবেদন করে। এই নয় দিনব্যাপী উৎসবে ভক্তরা ভজন-কীর্তন, নামগান ও নানাবিধ মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা করে থাকেন।

ছবিঘর

ভিডিও

বাংলাদেশের রথযাত্রা ২০২৬

শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা কবে?

গ্যালারি

সব দেখুন →

এই উৎসব কোথায় হয়

মন্দিরবিডির তালিকায় এখন পর্যন্ত এমন ১টি মন্দির আছে, যেখানে শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা পালিত হয়।

জেলা অনুযায়ী

শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা পালিত হয় এমন কোনো মন্দির চেনেন?

এখনো কোনো উত্তর নেই

এই বিষয়ে প্রশ্ন করুন →

সম্পর্কিত দেবতা

🛕

জগন্নাথ

মন্দির দেখুন →

তথ্য

ধরন

উৎসব

সময়কাল

৯ দিন

আরও উৎসব দেখুন

বাংলাদেশের সকল সনাতন উৎসব ও পূজার তালিকা

সব উৎসব

সচরাচর জিজ্ঞাসা

শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা কবে?

শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা-এর পরের তারিখ এখনো যোগ করা হয়নি; পঞ্জিকায় তিথি দেখুন। সর্বশেষ পালিত হয়েছিল বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ (দ্বিতীয়া)।

রথযাত্রা কবে পালিত হয়?

প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা পালিত হয়।

রথযাত্রা দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা কোনটি?

ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরীতে অনুষ্ঠিত রথযাত্রা সবচেয়ে প্রাচীন, বৃহৎ এবং বিশ্ববিখ্যাত। এটি চাক্ষুষ করার জন্য পুরীই সেরা স্থান।

রথযাত্রায় কোন কোন দেব-দেবীর পূজা করা হয়?

রথযাত্রায় মূলত ভগবান জগন্নাথ (শ্রীকৃষ্ণ), তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলভদ্র (বলরাম) এবং কনিষ্ঠা ভগ্নী সুভদ্রা দেবীর পূজা করা হয়। এই তিন দেব-দেবীকে তিনটি পৃথক সুসজ্জিত কাঠের রথে বসিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে মাসির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

রথযাত্রার পূর্বে 'অণসর' বা অন্তরাল পর্বটি কী?

স্নানযাত্রার পর ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবী ১৫ দিনের জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান, যাকে 'অণসর' বলা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই সময় দেবতারা অসুস্থ থাকেন এবং তাঁদের সুস্থ করার জন্য কেবল বিশেষ আয়ুর্বেদিক পাচন বা ভেষজ ওষুধ নিবেদন করা হয়।

রথযাত্রায় 'ছেরাপহরা' আচারটির তাৎপর্য কী?

'ছেরাপহরা' হলো রথযাত্রার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচার যেখানে স্থানীয় রাজা বা কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথ পরিষ্কার করেন। এই আচারটি প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে যে ভগবানের দরবারে রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা সকলেই সমান এবং ঈশ্বরের সেবায় কোনো অহংকারের স্থান নেই।

রথযাত্রার রশি টানার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব কী?

সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে ভক্তিভরে রথের রশি স্পর্শ করলে বা টানলে মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সমস্ত পাপ দূর হয়। এই পুণ্যকর্মের মাধ্যমে ভক্তরা পরম মোক্ষ বা পুনর্জন্মের চক্র থেকে চিরস্থায়ী মুক্তি লাভ করেন বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।

'উল্টো রথ' বা বহুড়া যাত্রা বলতে কী বোঝায়?

রথযাত্রার শুরু থেকে মাসির বাড়িতে (গুণ্ডিচা মন্দির) নয় দিন অবস্থানের পর দেবতারা যখন পুনরায় মূল মন্দিরে ফিরে আসেন, তাকে 'উল্টো রথ' বা বহুড়া যাত্রা বলা হয়। এটি রথযাত্রা উৎসবের সমাপ্তি নির্দেশ করে এবং অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে এই প্রত্যাবর্তন যাত্রা উদযাপিত হয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক রথযাত্রা ঢাকার ধামরাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়, যা 'ধামরাই শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা' নামে পরিচিত। প্রায় সাড়ে চারশত বছরের পুরোনো এই উৎসব ও রথ টানার দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থী ধামরাইয়ে সমবেত হন।

ঢাকা শহরের কোথায় কোথায় রথযাত্রা উৎসবের প্রধান শোভাযাত্রা দেখতে পাওয়া যায়?

ঢাকা শহরের প্রধান রথযাত্রা শোভাযাত্রাটি স্বামীবাগ ইসকন (ISKCON) মন্দির থেকে শুরু হয়ে ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। এছাড়া রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রমসহ ঢাকার বিভিন্ন লোকালয় ও মন্দিরে স্থানীয়ভাবে সুন্দর রথযাত্রার আয়োজন করা হয়।

ধামরাই জগন্নাথ রথের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ঐতিহ্য কী?

ধামরাইয়ের রথযাত্রা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অন্যতম প্রাচীন ও গৌরবময় ঐতিহ্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক কাঠের তৈরি বিশাল রথটি পুড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে ভারত সরকারের সহযোগিতায় পুনরায় লোহার কাঠামো ও কাঠের কারুকাজে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক।

রথযাত্রার ৯ দিন ধরে মন্দিরগুলোতে কী ধরনের ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠান পালিত হয়?

রথযাত্রার প্রথম দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী নয় দিন পর্যন্ত অস্থায়ী গুণ্ডিচা মন্দিরে (মাসির বাড়ি) শ্রী জগন্নাথ দেবের বিশেষ পূজা, আরতি ও মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। এই দিনগুলোতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভক্তিমূলক কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে শেষ হয়।